ঋণ আদায়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদারের পথে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি
রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে। কার্যকর নীতি, প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ও কঠোর ব্যবস্থাপনার ফলে ব্যাংকটি ২০২৫ সালে রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণ আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।
দেশের সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণ আদায়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে রূপালী ব্যাংক। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণ আদায়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যাংক পরিচালনা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।
২০২৫ সালে আমানত সংগ্রহ ও নতুন হিসাব খোলার ক্ষেত্রে রূপালী ব্যাংক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বছরে নতুন করে আট লাখ ৪৯ হাজারের বেশি হিসাব খোলা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় আড়াই লাখ বেশি। একই সময়ে ব্যাংকের মোট আমানত বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যার বড় অংশ এসেছে সুদবিহীন ও স্বল্প সুদের আমানত থেকে।
খেলাপি ঋণ আদায়ে গত বছর ছিল রূপালী ব্যাংকের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে ব্যাংকটি এককভাবে প্রায় এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা নগদ খেলাপি ঋণ আদায় করেছে। পাশাপাশি সমন্বয় ও পুনঃব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আদায় হয়েছে আরও পাঁচ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মোট আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এর ফলে খেলাপি ঋণের স্থিতি কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৬৪১ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। আগের বছর এই হার ছিল ৪১ দশমিক ৬০ শতাংশ।
শীর্ষ ঋণখেলাপিদের কাছ থেকেও বড় অঙ্কের অর্থ আদায় করতে পেরেছে ব্যাংকটি। শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি গ্রাহকের কাছ থেকে নগদ আদায় হয়েছে ৩৬১ কোটি টাকা এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে আদায় হয়েছে আরও এক হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির ইতিহাসে এটিকে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
খেলাপি ঋণ আদায়ের গতি বাড়াতে মামলা ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা হয়েছে। প্রধান কার্যালয় থেকে বিশেষ সফটওয়্যারের মাধ্যমে মামলার অগ্রগতি তদারকির ফলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮২৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, যেখানে আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ৫৭১টি। দ্রুত আইনি সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে একজন চিফ লিগ্যাল অ্যাডভাইজার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সহায়তার আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ঋণ পুনঃতফসিলেও ভূমিকা রেখেছে রূপালী ব্যাংক। গত বছর ৩৫ জন গ্রাহকের ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রায় ছয় হাজার ৯৭৩ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিত হয়েছে। আরও কিছু পুনঃতফসিল প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ঋণ আদায়ের পাশাপাশি উৎপাদনমুখী খাতেও বিনিয়োগ বাড়িয়েছে ব্যাংকটি। ২০২৫ সালে এসএমই খাতে নতুন করে এক হাজার ৪৭০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে, যা রূপালী ব্যাংকের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ পূরণ করেছে ব্যাংকটি।
রেমিট্যান্স আহরণেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৫ সালে রূপালী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক রেমিট্যান্স দেশে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। ডিজিটাল চ্যানেলের ব্যবহার বৃদ্ধি ও প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সেবা এই সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে নতুন সংযোজন হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রথমবারের মতো নিজস্ব প্রযুক্তিতে পরিচালিত মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ‘রূপালী ক্যাশ’ চালু করেছে ব্যাংকটি। এতে গ্রাহকদের জন্য সহজ ও নিরাপদ লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নতুন বছরের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, রূপালী ব্যাংককে একটি টেকসই, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাই তাদের লক্ষ্য। শৃঙ্খলা, জবাবদিহি এবং গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নের মাধ্যমে আর্থিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় খেলাপি ঋণ আদায়ের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
















