বিশ্ববাজারে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স সোনার দাম পাঁচ হাজার ডলার অতিক্রম করেছে। চলমান এই রেকর্ড উল্লম্ফনের মধ্য দিয়ে গত বছর সোনার দাম মোটের ওপর ষাট শতাংশের বেশি বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মধ্যে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে বাড়তে থাকা টানাপোড়েন বৈশ্বিক আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি বাজারে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সম্প্রতি তিনি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি হলে কানাডার ওপর শতভাগ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন।
অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দিকে ঝোঁকে। এর ধারাবাহিকতায় রুপার দামও সম্প্রতি প্রতি আউন্স একশ ডলার ছাড়িয়েছে, যা এর আগের বছরের তুলনায় প্রায় দেড়শ শতাংশ বৃদ্ধির প্রতিফলন।
মূল্যবান ধাতুর চাহিদা বাড়ার পেছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তুলনামূলক বেশি মূল্যস্ফীতি, মার্কিন ডলারের দুর্বলতা, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় অঙ্কের সোনা কেনা এবং চলতি বছরে সুদের হার আরও কমতে পারে—এমন প্রত্যাশা।
ইউক্রেন ও গাজায় চলমান যুদ্ধ, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার ঘটনাও সোনার দামে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোনার অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো এর সীমিত প্রাপ্যতা। বিশ্বে এখন পর্যন্ত মোট যে পরিমাণ সোনা উত্তোলন করা হয়েছে, তা কয়েকটি অলিম্পিক আকারের সুইমিং পুল ভরার মতোই। ভবিষ্যতে আরও কিছু সোনা উত্তোলনের সম্ভাবনা থাকলেও সরবরাহ ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এক বাজার বিশ্লেষকের ভাষায়, সোনা এমন একটি সম্পদ, যা অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ঋণের সঙ্গে যুক্ত নয়। অনিশ্চিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে এটি বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
২০২৫ সালে সোনার বাজার ছিল অত্যন্ত সক্রিয়। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শেয়ারের অতিমূল্যায়ন নিয়ে শঙ্কার কারণে বিনিয়োগকারীরা বারবার সোনার দিকে ঝুঁকেছেন, ফলে একের পর এক নতুন রেকর্ড গড়েছে দাম।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অনিশ্চয়তাই এই প্রবণতার বড় কারণ। সুদের হার কমার প্রত্যাশাও সোনার দামে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। সুদ কমলে বন্ডের মতো বিনিয়োগে লাভ কমে যায়, তখন বিনিয়োগকারীরা সোনা ও রুপার মতো বিকল্প সম্পদের দিকে ঝোঁকে।
চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক একাধিকবার সুদের হার কমাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুধু বিনিয়োগকারীরাই নয়, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও গত বছর বিপুল পরিমাণ সোনা তাদের মজুতভাণ্ডারে যুক্ত করেছে। এতে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর একটি প্রবণতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ সতর্ক করে বলেছেন, সংবাদনির্ভর এই বাজারে হঠাৎ ইতিবাচক কোনো বৈশ্বিক খবর এলে সোনার দামে সংশোধনও দেখা যেতে পারে।
এদিকে, সব দেশে সোনা কেনা যে কেবল বিনিয়োগের জন্যই হয়, তা নয়। বহু সংস্কৃতিতে উৎসব কিংবা বিয়ে ও অন্যান্য আনন্দঘন অনুষ্ঠানে সোনা উপহার দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। ভারতে দীপাবলি উৎসবকে সোনা কেনার জন্য শুভ সময় হিসেবে ধরা হয়।
এক আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের হিসাবে, ভারতের পরিবারগুলোর হাতে থাকা সোনার মূল্য দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় নব্বই শতাংশের কাছাকাছি। অন্যদিকে, চীন বিশ্বে সোনার সবচেয়ে বড় ভোক্তা বাজারগুলোর একটি। সেখানে নতুন বছর উপলক্ষে সোনার চাহিদা সাধারণত বাড়ে, যা এবারও আংশিকভাবে দেখা যাচ্ছে।
















