দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা কথিত নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে বা প্রায় শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি প্রকাশ্যেই স্বীকার করেন, এই বৈশ্বিক ব্যবস্থা আর আগের মতো কার্যকর নেই।
সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক পদক্ষেপ সেই ধারণাকে আরও স্পষ্ট করেছে। ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান, গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি এবং বিরোধিতা করলে ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা এই ব্যবস্থার ভিত্তিকে নড়িয়ে দিয়েছে বলে মত পর্যবেক্ষকদের।
কার্নি বলেন, অতীতে যাকে নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা বলা হতো, তা অনেকটাই ছিল এক ধরনের অভিনয়। সবাই যেন নিয়ম মানছে এমন ভান করত বলেই ব্যবস্থাটি টিকে ছিল। কিন্তু যখন শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো সেই অভিনয় বন্ধ করে দেয়, তখন পুরো কাঠামো ভেঙে পড়তে শুরু করে। তার ভাষায়, বিশ্ব এখন কোনো রূপান্তরের মধ্যে নেই, বরং একটি বড় ধরনের ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এর পরদিন দাভোসে দেওয়া বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করেন, পুরোনো ধারণা আর তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি ইউরোপকে দুর্বল বলে আখ্যা দেন এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের ইচ্ছার কথা আবারও প্রকাশ করেন। গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের মতামত উপেক্ষা করেই তিনি বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে ওই ভূখণ্ড প্রয়োজন এবং এতে সম্মতি না দিলে তার পরিণতি মনে রাখা হবে।
এই অবস্থান ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ন্যাটোর সাবেক এক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর মিত্র নয়, বরং শিকারি শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ইউরোপের পক্ষ থেকে সীমিত প্রতিক্রিয়া হিসেবে গ্রিনল্যান্ডে অল্পসংখ্যক সেনা মোতায়েন করা হলেও, তার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে।
মানবাধিকার আইনজীবী ও বিশ্লেষকেরা বলছেন, নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার পতন নতুন কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আদালতের রায় নিজের স্বার্থে উপেক্ষা করে এসেছে। জলবায়ু চুক্তি, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কিংবা অতীতের বিচারিক রায়—সব ক্ষেত্রেই এই প্রবণতা দেখা গেছে।
সমালোচকেরা আরও বলছেন, এই ব্যবস্থার ভণ্ডামি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের সময়। হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হলেও পশ্চিমা দেশগুলো কার্যত নীরব থেকেছে। আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নে এই দ্বৈত মানদণ্ডই তথাকথিত নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস করেছে বলে মত অনেকের।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুকে ঘিরে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে দিয়েছে, তাদের কাছে কোন বিষয়গুলো সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। গাজা বা বৈশ্বিক দক্ষিণের দুর্দশার চেয়ে ইউরোপীয় ভূখণ্ড হুমকির মুখে পড়লেই নিয়মের কথা জোরালোভাবে তোলা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ছোট দেশগুলো বা বৈশ্বিক দক্ষিণের জন্য এই ভাঙন নতুন কিছু নয়। তারা বহুদিন ধরেই নিয়মের চেয়ে শক্তির ওপর নির্ভরশীল বিশ্বব্যবস্থার বাস্তবতা দেখে আসছে। তবে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার জন্য এটি এক বড় ধাক্কা, কারণ তারা প্রথমবারের মতো বুঝতে পারছে, যে ব্যবস্থা তাদের নিরাপত্তা দিত বলে ধারণা করা হতো, সেটি আর কার্যকর নেই।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের ধারণা, বিশ্ব এখন শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন যুগে প্রবেশ করছে, যেখানে নিয়ম নয়, ক্ষমতাই হবে মূল নিয়ামক।
















