ওয়াশিংটন—যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার বিরুদ্ধে জনমত দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। মিনেসোটায় এক মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনার পর দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, আর এ প্রেক্ষাপটে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এখনই কংগ্রেসের হস্তক্ষেপের উপযুক্ত সময়।
বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে অভিবাসননীতি বিশেষজ্ঞ ও অধিকারকর্মীরা জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন প্রয়োগ নীতির প্রতি জনসমর্থন কমে যাওয়ায় আইনপ্রণেতাদের জন্য সংস্কারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনে এই অভিবাসন ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক আইনজীবী কেট ভয়েট বলেন, দেশটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের মুখে দাঁড়িয়ে। তার ভাষায়, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক আন্দোলন দেখা যাচ্ছে। অনেক মানুষ এখন বুঝতে পারছে যে সংস্থাটি সহিংসভাবে এবং কার্যত জবাবদিহিহীনভাবে কাজ করছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ, ভয় ও আন্দোলনের তাগিদ বেড়েছে।
তবে পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, নীতির মোড় ঘোরানো সহজ নয়। গত বছর রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসে পাস হওয়া করসংক্রান্ত আইনে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ করা হয়। এর মধ্যে চার বছরে প্রায় পঁচাত্তর বিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থাকে—যার বড় অংশই আটক কেন্দ্র সম্প্রসারণ ও অভিযান জোরদারে ব্যয় হবে। সমালোচকেরা বলছেন, এই অর্থের ব্যবহারে কার্যকর নজরদারি নেই।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সংস্থাটির সদস্যসংখ্যা বেড়ে দুই বাইশ হাজারের বেশি হয়েছে। তাদের লক্ষ্য প্রতিদিন এক লক্ষ মানুষ আটক করা এবং বছরে প্রায় দশ লক্ষ মানুষকে বহিষ্কার করা। অধিকারকর্মীদের মতে, এই সংখ্যাগুলোই সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করছে।
মিনেসোটায় সাঁইত্রিশ বছর বয়সী রিনি নিকোল গুড নিহত হওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রশাসনের বক্তব্য নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। শুরুতে বলা হয়েছিল, তিনি নাকি কর্মকর্তাকে গাড়িচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পরে প্রশাসন তাকে ‘ঘরোয়া সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেয় এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে তদন্ত থেকে সরিয়ে দেয়। এতে ক্ষোভ আরও বাড়ে।
এরপর রাজ্যে অতিরিক্ত ফেডারেল সদস্য মোতায়েন করা হয় এবং দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এসব বিক্ষোভকে প্রশাসন ‘উসকানিদাতা’ ও ‘বিদ্রোহী’দের কাজ বলে উল্লেখ করে। একই সঙ্গে মিনেসোটার গভর্নর ও মিনিয়াপোলিসের মেয়রের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু হয়।
রাজ্য সরকার ও কয়েকটি শহর আদালতে মামলা করে অভিযোগ করেছে, সংস্থার সদস্যরা নিয়মিতভাবে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে নাগরিকদের হয়রানি ও আটকের ঘটনাও দেখা গেছে।
মিনেসোটার এক পুলিশপ্রধান জানান, কোনো কারণ ছাড়াই মানুষকে থামিয়ে কাগজপত্র দেখাতে বাধ্য করা হচ্ছে এবং এসব ঘটনার শিকার সবাই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষ।
জাতীয় অভিবাসন আইন কেন্দ্রের নীতিবিষয়ক প্রধান হাইডি অল্টম্যান বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে যে করদাতাদের অর্থ অভিবাসন প্রয়োগের জন্য নয়, বরং ক্ষমতা প্রদর্শনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
জনমত জরিপেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে অর্ধেকের বেশি মানুষ মনে করেছেন, সংস্থার কার্যক্রম কমিউনিটিকে আরও অনিরাপদ করে তুলছে এবং বেশির ভাগ মানুষ বলছেন, তাদের পদ্ধতি অতিরিক্ত কঠোর।
অন্য এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ ভোটার গণহারে অভিযান বন্ধের পক্ষে এবং প্রায় সবাই সংস্থার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও নথিভুক্ত করার অধিকার সমর্থন করেন।
তবে কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ থাকায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ডেমোক্র্যাটরা অর্থ বরাদ্দ কমানো ও জবাবদিহি বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেও সেগুলো এগোয়নি।
এই অবস্থায় অধিকারকর্মীরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের বার্ষিক বাজেট নিয়ে আলোচনাই এখন একটি বড় সুযোগ। বর্তমান প্রস্তাবে সংস্থার জন্য আরও শত শত মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে, অথচ সংস্কার বা নজরদারির বিষয়টি উপেক্ষিত।
গণতন্ত্র শক্তি প্রকল্পের পরিচালক বিয়াত্রিজ লোপেজ বলেন, এত বড় ও শক্তিশালী একটি সংস্থাকে আরও অর্থ দেওয়া অযৌক্তিক। মানবাধিকার সংগঠনের এক নেতা বলেন, এখন আর ‘আগের মতো চলবে’—এই মানসিকতা চলতে পারে না। তাদের দাবি, আইনপ্রণেতাদের উচিত সংস্থার লাগাম টেনে ধরা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা।
















