যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের সর্বশেষ ২০২৫ মিলিটারি পাওয়ার রিপোর্টে বলা হয়েছে, চীন দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর অংশ হিসেবে পাকিস্তান ও বাংলাদেশে পিপলস লিবারেশন আর্মি বা পিএলএর ঘাঁটি স্থাপনের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের পদক্ষেপ ভারতের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডকে সংযুক্তকারী সংকীর্ণ শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’ এলাকায়।
পেন্টাগনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জিবুতিতে থাকা একমাত্র বিদেশি সামরিক ঘাঁটির বাইরে চীন আরও কিছু দেশে লজিস্টিক ও সামরিক সুবিধা গড়ে তুলতে আগ্রহী। এই তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হিসেবে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের নাম উঠে এসেছে। এতে ভারতের নিরাপত্তা মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, কারণ শিলিগুড়ি করিডর ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কৌশলগত পথ।
নয়াদিল্লি এই উদ্যোগকে চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে, যার লক্ষ্য ভারত মহাসাগর অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার ও ভারতের চারপাশে কৌশলগত বলয় তৈরি করা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন নৌ ও বিমান বাহিনীর জন্য লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করতে চায়, যা ভবিষ্যতে সামরিক ঘাঁটির রূপ নিতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় সেনাবাহিনী দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় শিলিগুড়ি করিডর সুরক্ষায় নতুন করে তিনটি সামরিক গ্যারিসন স্থাপন করা হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আসামের ধুবড়ি জেলায় লাচিত বরফুকন মিলিটারি স্টেশন চালু করা হয়। পাশাপাশি বিহারের কিশনগঞ্জ ও পশ্চিমবঙ্গের চোপড়ায় ফরওয়ার্ড ঘাঁটি গড়ে তুলে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
একজন জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানান, পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এসব ঘাঁটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সিকিম ও শিলিগুড়ি করিডর রক্ষায় নিয়োজিত ত্রি-শক্তি কোর ইতোমধ্যে রাফাল যুদ্ধবিমান, ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র ও আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়েছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গেও সমন্বিত নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
পেন্টাগনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের গভীর প্রতিরক্ষা সম্পর্কের কারণে সেখানে সামরিক ঘাঁটির সম্ভাবনা আলাদাভাবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে পাকিস্তান নৌবাহিনীর একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরে সফর করে, যা ১৯৭১ সালের পর প্রথম। এই সফরের পর সামরিক সহযোগিতা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
চীন অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, আঞ্চলিক সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবতা বিকৃত করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি যেকোনো লজিস্টিক সুবিধাই দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ভারত সামরিক ও নৌ সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সীমান্ত ও সমুদ্রপথে কৌশলগত প্রস্তুতি জোরদার করছে, যাতে দেশের কৌশলগত স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
















