আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বিচার, ন্যায়ের অপেক্ষায় লাখো রোহিঙ্গা
মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যার অভিযোগে গাম্বিয়ার করা মামলার চূড়ান্ত শুনানি আজ নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) শুরু হয়েছে, যা লাখো রোহিঙ্গার ন্যায়বিচার ও প্রত্যাবাসনের আশাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।
তিন সপ্তাহব্যাপী এই চূড়ান্ত শুনানিতে গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা, জাতিগত নির্মূল ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণের চেষ্টা করবে। আন্তর্জাতিক আইনি পর্যবেক্ষকদের মতে, এই মামলার রায় শুধু মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক অবস্থান নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা এই শুনানির দিকে তাকিয়ে আছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর অভিযানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়, জ্বালিয়ে দেওয়া হয় গ্রাম, এবং সহিংসতা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা। বর্তমানে তারা উখিয়া-টেকনাফ ও ভাসানচরের ক্যাম্পে বসবাস করছে।
কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা এনায়েত উল্লাহ বলেন, “আমাদের ওপর যে গণহত্যা হয়েছে তার প্রমাণ এখন সারা পৃথিবীতে আছে। আমরা চাই আন্তর্জাতিক আদালত সত্যটা স্বীকার করুক।”
একই ক্যাম্পের ফরিদ উল্লাহ বলেন, “বিচার হলে আমরা নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে নিজের দেশে ফিরতে চাই।”
২০১৯ সালে গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করলেও ভুক্তভোগী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সরাসরি মামলার পক্ষভুক্ত হয়নি। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ চাইলে তথ্যপ্রমাণ ও সাক্ষ্য দিয়ে মামলাটি আরও শক্তিশালী করতে পারত।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. ছালেহ শাহরিয়ার বলেন, শেখ হাসিনা সরকার রোহিঙ্গা সংকটকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধা নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলেও প্রকৃত সমাধানে আন্তরিক ছিল না। তাঁর মতে, গাম্বিয়াকে পূর্ণ সহযোগিতা না করায় মামলাটি দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে।
রোহিঙ্গা কমিউনিটির নেতা মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন,
“জাতিসংঘের রিপোর্টেও গণহত্যার প্রমাণ আছে। তবু বড় শক্তিগুলোর নীরবতা আর বাংলাদেশের সীমিত ভূমিকা আমাদের উদ্বিগ্ন করে।”
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ১২ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত শুনানি চলবে। তিনি জানান, যদি রায় রোহিঙ্গাদের পক্ষে যায়, তাহলে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বহুগুণে বাড়বে এবং প্রত্যাবাসনের পথ সহজ হবে।
এই শুনানির মধ্যেই মিয়ানমার–বাংলাদেশ সীমান্তে নতুন করে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের দৃষ্টি সরাতে এটি মিয়ানমারের কৌশল হতে পারে।
সাবেক কূটনীতিক এমদাদুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক চাপ বাড়লে মিয়ানমার আরও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে। তিনি সীমান্তে বিজিবি ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
















