বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের পর দিল্লি ও বিএনপি উভয় পক্ষই সম্পর্ক পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ঢাকায় তাঁর শেষকৃত্যে যোগ দিতে এসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কালো পোশাকে শোকাহত পরিবেশে হওয়া ওই বৈঠকে জয়শঙ্কর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে পাঠানো শোকবার্তা তারেক রহমানের হাতে তুলে দেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি খালেদা জিয়ার আদর্শ ও মূল্যবোধকে ভারত বাংলাদেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পথনির্দেশক হিসেবে উল্লেখ করেন।
এই বক্তব্যকে অতীতের অবস্থান থেকে বড় ধরনের পরিবর্তন হিসেবেই দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা। এক সময় ভারত খালেদা জিয়া ও বিএনপির রাজনীতিকে সন্দেহের চোখে দেখত। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর জোট এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ দিল্লির উদ্বেগের কারণ ছিল। সে সময় শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
তবে পরিস্থিতি পাল্টেছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং তাঁকে দেশে ফেরত না পাঠানো নিয়ে বাংলাদেশে ভারতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সহিংসতা, হত্যা ও ভিসা কার্যক্রম স্থগিতের ঘটনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এদিকে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না। ফলে রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে বিএনপি মধ্যপন্থি ও উদার রাজনৈতিক অবস্থান নিতে চাইছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। দলটি ইতোমধ্যে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, যা ভারতের জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাসে থাকার পর গত ডিসেম্বরে দেশে ফিরে তারেক রহমান সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের কথা বলেছেন। ভারতের সাবেক কূটনীতিকদের মতে, তাঁর বক্তব্যে পরিপক্বতার ছাপ রয়েছে এবং তা দিল্লির কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে।
ভারতীয় বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপিই ভারতের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প। ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা নতুন শক্তি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটকে দিল্লি নিজেদের স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছে।
তবে অতীতের অবিশ্বাস সহজে কাটবে না বলেও মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিএনপির উপদেষ্টারা বলছেন, সত্যিকারের নতুন অধ্যায় শুরু করতে হলে অতীত থেকে স্পষ্টভাবে বেরিয়ে আসতে হবে। তাদের মতে, ভবিষ্যৎ সরকার হলে বিএনপি ভারত ও চীনের সঙ্গে সমান দূরত্ব বজায় রেখে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দেবে।
বিএনপি সূত্র জানায়, দল ক্ষমতায় এলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে ভারতের ওপর চাপ অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে তারা মনে করছে, ভারতের নীতিগত পরিবর্তন না হলে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব আগামী সরকারকেও চাপে ফেলতে পারে।
সম্প্রতি ক্রীড়াঙ্গনেও দুই দেশের টানাপোড়েন প্রকাশ পেয়েছে। ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের অনুরোধে আইপিএল দল কলকাতা নাইট রাইডার্স বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেয়, যা বাংলাদেশে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনের আগে ভারত ও বিএনপির মধ্যে যোগাযোগ ও সৌজন্য বাড়লেও সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের পর দুই দেশের জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠনই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।















