লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ‘টার্গেট গেম’-এ বিপর্যস্ত ডেটাবেজ; তালিকায় মুকেশ আম্বানি ও বেল পরীর নাম
বাংলাদেশের জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন প্রক্রিয়ায় এক অভাবনীয় ও ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি ডেটাবেজে ১৮ বছর বয়সী এক তরুণীকে ১৯ সন্তানের জননী হিসেবে নিবন্ধিত করা হয়েছে। আরও বিচিত্র বিষয় হলো, কাল্পনিক সেই শিশুদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘মুকেশ আম্বানি’ কিংবা ‘বেল পরী’। স্থানীয় সরকার বিভাগের ‘টার্গেট’ পূরণের চাপে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে এই ‘ভুতুড়ে’ নিবন্ধনের উৎসব চলছে। রাষ্ট্রের মৌলিক ডেটাবেজ নিয়ে এমন ছিনিমিনি কেবল প্রশাসনিক দেউলিয়াত্বই নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক চরম হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
জন্মনিবন্ধন একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রথম ভিত্তি। কিন্তু বর্তমানে এই ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া অনিয়ম পুরো পরিকল্পনা ব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
‘টার্গেট গেম’: যেভাবে চলছে জালিয়াতি
রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে তৃণমূল পর্যায়ে নিবন্ধনের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণের প্রবল চাপ থাকে। এই চাপ থেকেই জন্ম নিয়েছে এক অশুভ প্রতিযোগিতা:
- ভুয়া দম্পতি ও শিশু: লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে পুরস্কার জেতার আশায় ইউপি সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রকৃত নাগরিকদের অজান্তেই তাঁদের পরিচয় ব্যবহার করে কাল্পনিক দম্পতি সাজাচ্ছেন।
- মৃত্যুনিবন্ধনের ফাঁদ: এসব দম্পতির নামে ভুয়া শিশু নিবন্ধিত করার কয়েকদিনের মধ্যেই তাদের ‘মৃত’ দেখানো হচ্ছে। মূলত জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন করলে কোনো ফি দিতে হয় না বলেই এই কৌশল বেছে নেওয়া হচ্ছে।
- অসংলগ্ন তথ্য: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় দেখা গেছে, ১৯ সন্তানের মা হিসেবে নিবন্ধিত তরুণীর অধিকাংশ সন্তানই জন্মের কয়েক দিনের মধ্যে মারা গেছে—যা জৈবিক ও বাস্তবতার নিরিখে অসম্ভব।
জাতীয় নিরাপত্তা ও পরিকল্পনায় ঝুঁকি
এই জালিয়াতি শুধু সংখ্যার খেলা নয়, এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী: ১. বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা: শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বাজেট তৈরি হয় নিবন্ধনের তথ্যের ভিত্তিতে। ডেটাবেজে হাজার হাজার ভুয়া মানুষের তথ্য থাকলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পনা মুখ থুবড়ে পড়বে। ২. অপরাধী ও বিদেশি নাগরিক: নিবন্ধনের এই দুর্বল ছিদ্র ব্যবহার করে অপরাধী চক্র কিংবা রোহিঙ্গারা অনায়াসে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব হাতিয়ে নিতে পারে। এটি দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য বড় ঝুঁকি।
প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধ ও দায়বদ্ধতা
প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেওয়া ‘টার্গেট’ থেকেই এই সংকটের শুরু। যখন নাগরিক অধিকারকে স্রেফ একটি সংখ্যাপূরণের লক্ষ্যমাত্রায় পরিণত করা হয়, তখন সেটি ব্যক্তিগত অনিয়ম ছাপিয়ে ‘প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধে’ রূপ নেয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই চিত্র সম্ভবত আইসবার্গের একটি ছোট্ট অংশ মাত্র—সারা দেশে এর ভয়াবহতা কতটা, তা এখনো অজানা।
জরুরি সুপারিশ
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে অবিলম্বে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া প্রয়োজন:
- শুদ্ধি অভিযান: উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে সারা দেশের ভুয়া নিবন্ধন শনাক্ত করে ডেটাবেজ পরিষ্কার করা।
- জবাবদিহিতা: এই জালিয়াতির সাথে সরাসরি জড়িত ইউপি সচিব থেকে শুরু করে তদারককারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ।
- নীতি পরিবর্তন: সংখ্যার পেছনে না ছুটে সঠিক ও মানসম্মত তথ্য নিশ্চিত করার দিকে মনোযোগ দেওয়া।















