তাইওয়ানের উপকূল ঘিরে চীন যখন সরাসরি গোলাবর্ষণসহ বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালাচ্ছে, তখনও দ্বীপটির দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় তেমন কোনো ব্যাঘাত দেখা যাচ্ছে না। বহু বছর ধরে এমন শক্তি প্রদর্শনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তুলনামূলকভাবে কম বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
নিউ তাইপেই সিটির বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী লিয়াও বলেন, যুদ্ধের আশঙ্কা তাঁকে ভাবাচ্ছে না। অবসর জীবনে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে মাহজং খেলছেন, শেয়ারবাজারের খোঁজ রাখছেন এবং নতুন বছরের আগে চুল কাটতে সেলুনে গেছেন। তাঁর ভাষায়, দৈনন্দিন জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তিনি বলেন, বহু দশক ধরে তাইওয়ানে বসবাস করতে করতে এসব পরিস্থিতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।
চুল কাটার সময় তাঁর সঙ্গে থাকা কর্মীও জানান, তিনি মহড়ার কথা জানতেনই না। কাজের চাপে এসব খেয়াল করার সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অনেকের মতে, কাজ আর স্বাভাবিক জীবনের ব্যস্ততায় চীনের সামরিক তৎপরতা নিয়ে সব সময় ভাবার সুযোগ সাধারণ মানুষের থাকে না।
তবে তাইওয়ানের মানুষ যে চীনের হুমকিকে একেবারে গুরুত্বহীন ভাবছে, তা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেলগুলোতে মহড়ার খবর ব্যাপকভাবে প্রচার হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু ভুয়া তথ্যও ছড়িয়েছে, যার মধ্যে তাইপেই ১০১ ভবনের কাছ দিয়ে যুদ্ধবিমান উড়ে যাওয়ার একটি ভিডিও ছিল, যেটিকে সরকার ভুয়া বলে জানিয়েছে।
চীন দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে নিজের অংশ দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের কথাও বলছে। ১৯৪৯ সালে গৃহযুদ্ধের পর আলাদা শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠার পর থেকেই দুই পাড়ের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সামরিক সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাইওয়ান ঘিরে তার তৎপরতাও বেড়েছে।
চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক মহড়াগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অস্ত্র সহায়তা প্যাকেজের প্রতিক্রিয়া এবং তাইওয়ানের বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি সতর্কবার্তা। বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এসব মহড়া বিচ্ছিন্নতাবাদ ঠেকানো এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়।
তবে লিয়াও মনে করেন, তাইওয়ানের শক্তিশালী অর্থনীতি এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পই দ্বীপটিকে বড় সংঘাত থেকে রক্ষা করবে। তিনি বলেন, শেয়ারবাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকাই প্রমাণ করে মানুষ যুদ্ধ আসন্ন মনে করছে না।
অনেকের মনে আছে ২০২২ সালের মহড়া, যা যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন কংগ্রেস নেতার তাইওয়ান সফরের পর শুরু হয়েছিল। সে সময় চীনের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র তৎপরতা নতুন মাত্রা নেয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানের আকাশ প্রতিরক্ষা শনাক্তকরণ অঞ্চলে চীনা অনুপ্রবেশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
জরিপগুলোও দেখাচ্ছে, এই চাপ মানসিক প্রভাব ফেলছে। অনেক মানুষ এখন আগের তুলনায় বেশি যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন। নিউ তাইপেই সিটির এক ফুলের দোকান মালিক ইয়েহ বলেন, মানুষ হয়তো কিছুটা অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছে। দোকানে ক্রেতারা আগের মতোই আসছেন, কেউ মহড়া নিয়ে কথা বলছে না। তবে তাঁর মতে, ভেতরে ভেতরে উদ্বেগ আছে এবং অনেকেই পরিস্থিতির কাছে নিজেকে অসহায় মনে করছেন।
ইয়েহ জানান, রাজনৈতিক বিভাজন ও চীনের সঙ্গে কিছু দলের ঘনিষ্ঠতা তাঁকে উদ্বিগ্ন করছে। এসব কারণে তিনি সাম্প্রতিক নির্বাচনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান বদলেছেন।
একই রকম অনুভূতির কথা বলেন ১৯ বছর বয়সী এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ওয়াং। তিনি জানান, পরিস্থিতি তাকে এতটাই ভাবাচ্ছে যে কখনো কখনো উইল লেখার কথাও মনে আসে। তাঁর মতে, এবারের পরিস্থিতি আরও বাস্তব মনে হচ্ছে, কিন্তু সাধারণ নাগরিক হিসেবে কিছু করার নেই।
এর মধ্যে সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনা ও ভূমিকম্প মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। ওয়াং বলেন, সতর্ক থাকা জরুরি হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
সব মিলিয়ে চীনের বড় সামরিক মহড়ার মধ্যেও তাইওয়ানে জীবন চলছে স্বাভাবিক গতিতে। তবে অভ্যস্ততার আড়ালে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ যে জমে আছে, তা অস্বীকার করছেন না অনেকেই।
















