লন্ডন থেকে উঠেছে কঠোরতার সুর। যুক্তরাজ্য ঘোষণা দিয়েছে, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব দ্য কঙ্গোর নাগরিকদের জন্য ভিসা সুবিধা সীমিত করা হচ্ছে। ব্রিটিশ সরকারের অভিযোগ, নতুন অভিবাসন প্রত্যাবাসন নীতিতে সহযোগিতা করতে ব্যর্থ হয়েছে মধ্য আফ্রিকার এই দেশটি। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, অ্যাঙ্গোলা ও নামিবিয়ার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, যাতে তারা তাদের নাগরিকদের দ্রুত ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে।
শনিবার গভীর রাতে এক বিবৃতিতে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, অবৈধভাবে অবস্থানকারী ও অপরাধে জড়িত অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ডিআর কঙ্গোর সহযোগিতা প্রত্যাশিত মাত্রায় নেই। এর ফল হিসেবে দেশটির জন্য দ্রুত ভিসা প্রক্রিয়া ও ভিআইপি সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, সহযোগিতা দ্রুত না বাড়লে ডিআর কঙ্গোর জন্য সব ধরনের ভিসা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পথেও হাঁটতে পারে যুক্তরাজ্য। তার কণ্ঠে ছিল কঠোর বার্তা। যদি কারও এই দেশে থাকার অধিকার না থাকে, তবে নিজ দেশকে তাকে ফিরিয়ে নিতে হবে। তিনি অ্যাঙ্গোলা ও নামিবিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এখন ডিআর কঙ্গোর উচিত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।
এই পদক্ষেপগুলো এসেছে গত মাসে ঘোষিত যুক্তরাজ্যের আশ্রয় নীতিতে বড় ধরনের সংস্কারের ধারাবাহিকতায়। সেই সংস্কারের আওতায় শরণার্থী মর্যাদাকে সাময়িক করা হয়েছে এবং কাগজপত্র ছাড়া প্রবেশকারীদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এটি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই নীতির লক্ষ্য ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ছোট নৌকায় আসা অনিয়মিত অভিবাসীদের নিরুৎসাহিত করা। এ বছর এখন পর্যন্ত প্রায় ঊনচল্লিশ হাজার মানুষ এভাবে যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছেন, যা গত বছরের তুলনায় বেশি হলেও দুই হাজার বাইশ সালের রেকর্ডের চেয়ে কম।
শাবানা মাহমুদ সংসদে বলেন, বর্তমান ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণহীন ও অন্যায্য হয়ে উঠেছে। তার মতে, কঠোর সত্য মেনে নিয়েই সীমান্ত সুরক্ষিত করতে হবে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, শরণার্থীদের মর্যাদা প্রতি ত্রিশ মাস পর পর পর্যালোচনা করা হবে এবং নিজ দেশ নিরাপদ ঘোষণা হলে তাদের ফেরত যেতে হবে। স্থায়ী বসবাসের আবেদন করতে এখন অপেক্ষা করতে হবে বিশ বছর, যেখানে আগে সময়সীমা ছিল পাঁচ বছর।
সরকার আরও জানিয়েছে, ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের দোহাই দিয়ে যাতে অবৈধ অভিবাসী ও বিদেশি অপরাধীরা প্রত্যাবাসন ঠেকাতে না পারে, সে জন্য আইন পরিবর্তনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাই থেকে এ পর্যন্ত পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষকে যুক্তরাজ্য থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে এই নীতির বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড়ও উঠেছে। সাবেক কূটনীতিক মার্ক ডেভিস একে লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেছেন এবং বলেছেন, এটি শরণার্থীদের প্রতি ব্রিটেনের ঐতিহাসিক মানবিক অবস্থান থেকে সরে আসা। সাবেক লেবার নেতা জেরেমি করবিন এই নীতিকে কঠোর ও নিষ্ঠুর আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি ইউরোপজুড়ে উগ্র ডানপন্থী শক্তিকে খুশি করার চেষ্টা।
রিফিউজি কাউন্সিলের প্রধান এনভার সলোমন সরকারকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এসব ব্যবস্থা অভিবাসন ঠেকাতে পারবে না, বরং পরিশ্রমী শরণার্থীদের নিরাপদ ও স্থিতিশীল জীবন গড়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দুই হাজার পঁচিশ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা বেড়ে প্রায় এক লাখ এগারো হাজারে পৌঁছেছে, যা রেকর্ড। অথচ একই সময়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্তের হার কমেছে। বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ আশ্রয়প্রার্থীই আইনসম্মত পথে যুক্তরাজ্যে আসেন।
কঠোরতা আর মানবিকতার টানাপোড়েনে যুক্তরাজ্যের এই নতুন নীতি এখন প্রশ্নের মুখে। সীমান্ত রক্ষার নামে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো ভবিষ্যতে দেশটির নৈতিক অবস্থানকে কোন পথে নিয়ে যাবে, সেই উত্তর এখনও সময়ের হাতে।
















