২০২৬ সালের নির্বাচনই হতে পারে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মেরামতের প্রধান সুযোগ; ভারতবিরোধী মনোভাব ত্যাগের আহ্বান
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বর্তমান শীতল সম্পর্ককে পুনরায় উষ্ণ করতে এবং দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নয়া দিল্লিকে কেবল একটি দলের ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শক্তিশালী করার পরামর্শ দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (ICG)। সংস্থাটি বলছে, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন দুই দেশের সম্পর্ক ঢেলে সাজানোর জন্য এক অনন্য সুযোগ।
কূটনৈতিক প্রতিবেদক | ঢাকা
ব্রাসেলসভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে ভারত যেভাবে এককভাবে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়ে এসেছে, তা বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাবকে উসকে দিয়েছে। ‘সোনালি অধ্যায়’ পরবর্তী এই সময়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে উভয় দেশকেই নমনীয় হওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
একক নির্ভরতার নেতিবাচক প্রভাব
আইসিজির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত বছরের পর বছর ধরে মনে করে এসেছে যে বাংলাদেশে তাদের স্বার্থ রক্ষা কেবল আওয়ামী লীগের মাধ্যমেই সম্ভব। এই ধারণাটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং জনগণের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ভারত যে ধাক্কা খেয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে এখন সব রাজনৈতিক অংশীজনের সঙ্গে সমানভাবে কাজ করা দিল্লির জন্য অপরিহার্য।
২০২৬-এর নির্বাচন: একটি নতুন সম্ভাবনা
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নয়া দিল্লি সম্ভবত বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক করবে না। তবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। আইসিজি মনে করে, নির্বাচনে বিএনপি একটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ঐতিহাসিক টানাপোড়েন থাকলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নয়া দিল্লির উচিত হবে বিএনপির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা।
ভারতবিরোধী রাজনীতি ও দিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগ
আইসিজি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, নির্বাচনে ভোট পাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ভারতবিরোধী মনোভাব ব্যবহার করা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। অন্যদিকে, নয়া দিল্লিকেও বাংলাদেশের নতুন সরকারের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত ট্রানজিট, পানি বণ্টন চুক্তি এবং ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত নিরসন করা জরুরি।
সম্ভাব্য সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি
প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, ২০২৬ সালে ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন এবং গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়াকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। যদি দুই দেশ এই উত্তেজনা প্রশমনে ব্যর্থ হয়, তবে সীমান্ত হত্যা, সাম্প্রদায়িক হামলা এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতা বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সুপারিশ ও আগামীর পথ
ক্রাইসিস গ্রুপ তাদের প্রতিবেদনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে:
- নয়া দিল্লির প্রতি: বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন মেনে নিয়ে সব দলের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়া এবং ভিসা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।
- ঢাকার প্রতি: ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং চরমপন্থা ও চোরাচালান রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা।
- সাধারণ স্বার্থ: অর্থনৈতিক ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ (People-to-people contact) বাড়ানো, যাতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কম পড়ে।
পরিশেষে বলা হয়েছে, উভয় দেশের নেতাদের উচিত তিক্ততা ও অবিশ্বাসের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে একটি গঠনমূলক এবং টেকসই কূটনৈতিক কাঠামো তৈরি করা।
















