বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক স্পষ্টভাবেই অবনতির পথে। সীমান্ত উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ, কূটনৈতিক বক্তব্যের কঠোরতা এবং পারস্পরিক সন্দেহ দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কে নতুন সংকট তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন এই সম্পর্ক নতুনভাবে সাজানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ভারতের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি নয়াদিল্লির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। টানা তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে তাঁর দল আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়ে ভারত যে অবস্থান নিয়েছিল, সেটিই বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়াতে ভূমিকা রাখে বলে মনে করা হচ্ছে। আগস্ট ২০২৪–এর গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারত সেই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হিমশিম খাচ্ছে।
হাসিনা বিদায়ের পর দুই দেশের মধ্যে বাগ্যুদ্ধ শুরু হয়। সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ে, একে অপরের বিরুদ্ধে উসকানির অভিযোগ ওঠে এবং বাণিজ্য ও যোগাযোগে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও নয়াদিল্লি তাদের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহ দেখায়নি। ভারতের দৃষ্টিতে, ফেব্রুয়ারি ২০২৬–এর জাতীয় নির্বাচনের ফলই ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ধারণে মুখ্য।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় বিএনপি সম্ভাব্য শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক সহজ ছিল না। তবে বর্তমান বাস্তবতায় বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারই ভারতের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য বিকল্প হতে পারে।
অন্যদিকে, দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও সম্পর্ক উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই জনসমর্থন পেতে ভারতবিরোধী বক্তব্য ব্যবহার করে থাকে। ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি, কঠোর অভিবাসন নীতি এবং সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর নির্বাচনও বাংলাদেশে ক্ষোভ বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বর্তমান উত্তেজনা সরাসরি যুদ্ধের দিকে না গেলেও এর ফল হতে পারে সীমান্ত সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, অবৈধ অভিবাসন বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে এক ছাত্রনেতা হত্যার পর সহিংস বিক্ষোভ এবং ভারতবিরোধী হামলা সেই ঝুঁকিরই উদাহরণ।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতের দীর্ঘদিনের নীতি ছিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি। যদি বিএনপি বা অন্য কোনো শক্তি সরকার গঠন করে, তবে ভারতের উচিত হবে সব রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা।
নির্বাচনের পর সম্পর্ক পুনর্গঠনে কয়েকটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ভারতের পক্ষ থেকে ভিসা ও বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ শিথিল করা, যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা এবং সদিচ্ছার বার্তা দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন সরকারের দায়িত্ব হবে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ বিবেচনায় নেওয়া, সীমান্তে সহিংসতা কমানো এবং উগ্রপন্থা দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
দুই দেশের মধ্যকার নদীর পানি বণ্টন, বিশেষ করে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি ভবিষ্যতে বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া সীমান্তে প্রাণহানি, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা এবং অভিবাসন প্রশ্নে সহযোগিতামূলক সমাধান খোঁজা জরুরি বলে মত বিশ্লেষকদের।
সব মিলিয়ে, শেখ হাসিনার পতন বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের একটি যুগের অবসান ঘটিয়েছে। সামনে যে পথ, তা সহজ নয়। তবে পারস্পরিক সম্মান, বাস্তববাদী কূটনীতি ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশ চাইলে এই সংকটকে নতুন অধ্যায়ের সূচনায় রূপ দিতে পারে।
















