জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় স্মরণকালের সর্ববৃহৎ জানাজায় লাখো মানুষের ঢল
শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির জানাজা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে জনসম্পৃক্ততার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে শোক ও শ্রদ্ধায় একাকার হয় পুরো জাতি।
শনিবার (২০ ডিসেম্বর) রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবন-এর দক্ষিণ প্লাজা এলাকায় অনুষ্ঠিত হয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির স্মরণকালের ঐতিহাসিক জানাজা। লাখো মানুষের অংশগ্রহণে এই জানাজা পরিণত হয় এক বিশাল জনসমুদ্রে। এর আগে দেশের ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জানাজায় এ ধরনের বিপুল জনসমাগমের নজির দেখা গিয়েছিল।
শহীদ ওসমান হাদির জানাজায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রধান, বিদেশি রাষ্ট্রদূতসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। দল-মত নির্বিশেষে ছাত্র-জনতা, শ্রমজীবী মানুষ, পেশাজীবী ও সাধারণ নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে পুরো এলাকা শোকে স্তব্ধ হয়ে ওঠে।
শনিবার সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ দলে দলে জানাজাস্থলে জড়ো হতে শুরু করেন। বেলা ১২টার আগেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। জনস্রোত ফার্মগেটের খামারবাড়ি মোড় ও আসাদগেট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, উত্তর দিকে চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র এলাকাও মানুষের ভিড়ে ভরে ওঠে।
নজিরবিহীন এই জনসমাগমকে কেন্দ্র করে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও আশপাশের এলাকায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি র্যাব ও আনসার মোতায়েন করা হয়, বিশেষ টহলে ছিল সেনাবাহিনী। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসন এক হাজারের বেশি বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের হিমঘর থেকে সহযোদ্ধা ও সমর্থকদের অংশগ্রহণে এক বিশাল শোক মিছিলের মাধ্যমে শহীদ হাদির মরদেহ জানাজার স্থলে আনা হয়। জানাজা শেষে পরিবারের বিশেষ ইচ্ছা ও সহযোদ্ধাদের সম্মতিতে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর কেন্দ্রীয় মসজিদ কমপ্লেক্সে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।
গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগর কালভার্ট রোড এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণার সময় খুব কাছ থেকে গুলিবিদ্ধ হন ওসমান হাদি। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে এবং অবশেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরদিন শুক্রবার সন্ধ্যায় তার মরদেহ ঢাকায় পৌঁছায়।
গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে ওসমান হাদি তরুণ প্রজন্মের কাছে সাহস, প্রতিবাদ ও দেশপ্রেমের এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে লাখো মানুষের এই উপস্থিতি তার সেই জনপ্রিয়তা ও আত্মত্যাগেরই প্রতিফলন—যা তাকে সমকালীন রাজনীতির এক অনন্য শহীদ হিসেবে ইতিহাসে স্থায়ী করে রাখবে।
















