স্টকহোম—শান্তির প্রতীকের গায়ে যুদ্ধের ছায়া লেগেছে—এমন অভিযোগ তুলে নোবেল ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে সুইডেনে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেছেন উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তিনি অর্থের ভয়াবহ অপব্যবহার এবং যুদ্ধাপরাধকে সহায়তার শামিল বলে আখ্যা দিয়েছেন।
অ্যাসাঞ্জ জানান, এই পুরস্কারের অর্থ হিসেবে নির্ধারিত এক কোটি দশ লাখ সুইডিশ ক্রোনা যেন মাচাদোর কাছে হস্তান্তর না করা হয়, সে লক্ষ্যে তিনি আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। তার ভাষায়, শান্তির নামে দেওয়া এই পুরস্কার আসলে আগ্রাসন ও রক্তপাতকে উৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
অভিযোগপত্রে নোবেল ফাউন্ডেশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত ৩০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তা এবং আগ্রাসী যুদ্ধের অর্থায়নের অভিযোগ তোলা হয়েছে। অ্যাসাঞ্জের দাবি, মাচাদোকে পুরস্কৃত করার মাধ্যমে শান্তির এক প্রতীককে যুদ্ধের অস্ত্রে রূপান্তর করা হয়েছে।
অক্টোবরে নোবেল কমিটি মাচাদোকে এই পুরস্কার দেয়, ভেনেজুয়েলায় গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও স্বৈরতন্ত্র থেকে শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের পক্ষে তার ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে। তবে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই বিতর্ক দানা বাঁধে। গাজায় ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের প্রকাশ্য সমর্থন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার ফোনালাপ সমালোচনার আগুনে ঘি ঢালে। ক্ষমতায় গেলে জেরুজালেমে ভেনেজুয়েলার দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা নীতির প্রতি তার সমর্থনও প্রশ্ন তুলেছে অনেকের মনে। ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে সামরিক চাপ বাড়াচ্ছে, যার অংশ হিসেবে ক্যারিবীয় সাগর ও লাতিন আমেরিকার উপকূলে একাধিক হামলা চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে বহু মানুষের প্রাণ গেছে।
অ্যাসাঞ্জ বলেন, ট্রাম্পের এই সামরিক অভিযানে মাচাদোর সমর্থন তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্যতা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত করে। আলফ্রেড নোবেলের উইলে স্পষ্টভাবে বলা আছে, শান্তি পুরস্কার তারই প্রাপ্য, যিনি মানবজাতির কল্যাণে ও জাতিগুলোর মধ্যে ভ্রাতৃত্ব গড়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখবেন।
উইকিলিকসের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, এই অর্থ মানবিক কাজে ব্যবহারের বদলে আগ্রাসন ও যুদ্ধাপরাধে ব্যয় হওয়ার বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে। যদিও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করে নরওয়ের একটি কমিটি, অ্যাসাঞ্জের যুক্তি—অর্থের দায়ভার স্টকহোমভিত্তিক নোবেল ফাউন্ডেশনেরই। সুইডিশ পুলিশ নিশ্চিত করেছে, তারা অভিযোগটি গ্রহণ করেছে।
জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ২০০৬ সালে উইকিলিকস প্রতিষ্ঠা করেন এবং ২০১০ সালে মার্কিন সামরিক গোপন নথি প্রকাশের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলেন। পরবর্তী এক দশকের বেশি সময় তিনি আশ্রয়, কারাবাস ও আইনি লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে গেছেন। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে মুক্তি পেয়ে তিনি নিজ দেশে অস্ট্রেলিয়ায় ফেরেন।
আজ আবারও তিনি খবরের শিরোনামে—এইবার তথ্য ফাঁস নয়, বরং শান্তির নামে যুদ্ধকে বৈধতা দেওয়ার অভিযোগে। তার কণ্ঠে প্রশ্ন, নোবেল কি এখনও শান্তির প্রতীক, নাকি ক্ষমতার রাজনীতিতে বন্দী এক পুরোনো স্বপ্ন?
















