৭ অক্টোবর ২০২৫
বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্মের এক নতুন ঢেউ দেখা যাচ্ছে—‘জেন-জি’ বা ডিজিটাল যুগে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের আন্দোলন। সামাজিক বৈষম্য, দুর্নীতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকট—সব মিলিয়ে হতাশ তরুণরা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় রাস্তায় নেমেছে। উন্নত হোক বা উন্নয়নশীল, জেন-জিরা নানা দেশে প্রচলিত শাসনব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও চিন্তার কাঠামোকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
কারা এই জেন-জি?
ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে জন্ম নেওয়া তরুণরাই মূলত জেন-জি প্রজন্ম। অনেকে ভাবেন, তারা কেবল শহুরে বা সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির প্রতিনিধি; কিন্তু বাস্তবে এই প্রজন্মের মধ্যে সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক তরুণরাও আছেন। তাদের শক্তি যেমন প্রশংসনীয়, তেমনি রয়েছে সীমাবদ্ধতাও—যার প্রকাশ ঘটছে তাদের আন্দোলনের ধরনে।

মরক্কো: ‘জেন-জি-২১২’ আন্দোলনের দাবিতে উত্তাল শহর
মরক্কোর বিভিন্ন শহরে টানা কয়েক রাত ধরে তরুণদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ চলছে। ‘জেন-জি-২১২’ নামে সংগঠিত এই আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছেন ছাত্র ও বেকার তরুণরা। তাদের দাবি—স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচারে সংস্কার আনতে হবে।
তাদের অভিযোগ, সরকার বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে ২০৩০ বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে, অথচ গ্রামীণ হাসপাতালে সেবা নেই, শিক্ষাব্যবস্থা ভঙ্গুর, যুব বেকারত্ব ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
আগাদিরে কয়েকজন গর্ভবতী নারীর মৃত্যুর পর থেকেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। সরকার দমন-পীড়ন চালালে অন্তত তিনজন নিহত ও শতাধিক আহত হন। প্রধানমন্ত্রী আলোচনার প্রস্তাব দিলেও আন্দোলনকারীরা সরকারের পদত্যাগ দাবি করছেন।
মাদাগাস্কার: পানি ও বিদ্যুৎ সংকট থেকে সরকার পতনের দাবিতে
মাদাগাস্কারেও তরুণরা রাস্তায়। শুরুতে পানি ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রতিবাদে নেমে আসলেও এখন আন্দোলন সরকার পতনের দাবিতে রূপ নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি রাজোয়েলিনা সরকার বিলুপ্ত ঘোষণা করে তরুণদের দুর্দশা বোঝার আশ্বাস দিয়েছেন। তবু সহিংসতায় কমপক্ষে ২২ জন নিহত হয়েছেন বলে জাতিসংঘ জানিয়েছে, যদিও সরকার এই সংখ্যা নিয়ে আপত্তি তুলেছে।
লাতিন আমেরিকা: পেরুতে পেনশন আইন থেকে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন
পেরুতেও তরুণরা বিক্ষোভে সরব। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে পেনশন সংস্কার আইনের প্রতিবাদ দিয়ে শুরু হয়ে তা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। প্রেসিডেন্ট দিনা বোলুয়ার্তের প্রতি আস্থা এখন প্রায় শূন্য; জুলাইয়ের এক জরিপে তার জনপ্রিয়তা মাত্র ২.৫ শতাংশ।
নেপাল: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা থেকে বিপ্লব
নেপালে গত সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া আন্দোলন হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই আন্দোলন ভয়াবহ রূপ নেয়—সরকারি ভবনে আগুন, শতাধিক আহত ও অন্তত ২২ জন নিহত হয়। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়।
এই আন্দোলন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও তরুণদের অনুপ্রেরণা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক বার্ট কামার্টসের মতে, তরুণরা মনে করছে কেউ তাদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করছে না। গণতন্ত্রে বিশ্বাস রেখেও তারা বর্তমান ব্যবস্থায় আশাহত।
এসওএএস ইনস্টিটিউটের পরিচালক সুবির সিনহার মতে, ক্ষমতাসীন অভিজাতদের অগ্রাধিকার ও তরুণদের বাস্তব জীবনের মধ্যে গভীর অমিল দেখা দিচ্ছে—যার ফলে জেন-জিরা ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশায় ভুগছে এবং সীমান্ত পেরিয়ে একে অপরের সঙ্গে সংহতি গড়ে তুলছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে রাস্তায়
ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই এই প্রজন্মের প্রধান শক্তি। মরক্কোর ‘জেন-জি-২১২’ আন্দোলনের ডিসকর্ড সার্ভার কয়েক দিনে ৩ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার সদস্যে পৌঁছে যায়।
মাদাগাস্কারের তরুণরাও ‘জেন-জি মাদা’ নামে ফেসবুক ও টিকটকে সংগঠিত হয়ে নাগরিক সমাজ ও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ডিজিটাল আন্দোলন বিকেন্দ্রীভূত এবং নেতা-বিহীন হওয়ায় সরকারগুলোর পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জেন-জি প্রজন্ম আর কেবল অনলাইন নয়—তারা এখন রাস্তায় নেমে বাস্তব পরিবর্তনের ডাক দিচ্ছে। তাদের প্রতিবাদের তরঙ্গ এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, ডিজিটাল পর্দা পেরিয়ে সরাসরি জনপথে।
















