যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএআইডি অর্থায়ন কমে যাওয়ায় মালাউইয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মাতৃমৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে পারে।
দক্ষিণ মালাউইয়ের মুলাঞ্জে জেলায় একটি গ্রামীণ স্বাস্থ্য পোস্টে বসে নার্সিং কর্মকর্তা আইরিন মাকাতা জানান, আগে যেখানে প্রতিদিন বহু নারী সেবা নিতে আসতেন, সেখানে এখন অর্থসংকটে কেন্দ্রটি দুই সপ্তাহে একবারও পুরোপুরি খোলা রাখা যাচ্ছে না। গর্ভকালীন পরীক্ষা, প্রসব সহায়তা, ওষুধ সরবরাহ ও জরুরি রেফারালের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
এই ধরনের স্বাস্থ্য পোস্টগুলো জেলা হাসপাতালের চাপ কমাতে এবং দূরবর্তী জনগোষ্ঠীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের ইউএসএআইডি তহবিল কাটছাঁটের পর সারা দেশে অন্তত ২০টি স্বাস্থ্য পোস্ট বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে হাজারো নারী ও শিশু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
মাকাতা বলেন, এখন অনেক নারী জেলা হাসপাতালে যেতে পারছেন না, কারণ দূরত্ব ও যাতায়াত ব্যয় তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে গর্ভাবস্থার প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ও পরিচর্যা তারা পাচ্ছেন না।
ইউএসএআইডি আগে মালাউইয়ের মোট স্বাস্থ্য বাজেটের প্রায় ৩২ শতাংশ জোগান দিত। ২০২২ সালে শুরু হওয়া মোমেন্টাম কর্মসূচির আওতায় ১৪টি জেলায় ২৪৯টি স্বাস্থ্য পোস্ট স্থাপন ও শক্তিশালী করা হয়েছিল। তবে এ বছর ট্রাম্প প্রশাসনের বিদেশি সহায়তা পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্তে কর্মসূচিটি বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে মোবাইল ক্লিনিক বন্ধ, প্রশিক্ষণরত স্বাস্থ্যকর্মীরা অনিশ্চয়তায় পড়েন এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বিক্রি করে দেওয়া হয়।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল কিছু এলাকায় সীমিত সহায়তা অব্যাহত রাখলেও তা পর্যাপ্ত নয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নতুন মায়েরা ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মুলাঞ্জের কমিউনিটি নেতা ম্যাসিভ মাতেকেনিয়া বলেন, দূরত্বের কারণে অনেক নারী পথে সন্তান প্রসব করছেন, যা মা ও শিশুর জন্য প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করছে। পরিবার পরিকল্পনা সেবা বন্ধ থাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বাড়ার শঙ্কাও রয়েছে।
রাজধানী লিলংগোয়ের বওয়াইলা ফিস্টুলা সেন্টারের প্রধান সমন্বয়ক মার্গারেট ময়ো জানান, পর্যাপ্ত গর্ভকালীন নজরদারি না থাকলে অবস্টেট্রিক ফিস্টুলার মতো জটিলতা বাড়তে পারে। এই রোগে আক্রান্ত নারীরা শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি সামাজিক বঞ্চনার শিকার হন।
সরকারি হিসাবে, বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ায় ২০২৫ সালের জন্য প্রজনন ও মাতৃস্বাস্থ্যে প্রায় ২৩ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতির পূর্বাভাস ছিল আগেই। ইউএসএআইডি কাটছাঁটে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
তবে মালাউই সরকারের স্বাস্থ্য সচিব ডা. স্যামসন মন্ডোলো বলেন, অতীতেও এমন সংকট মোকাবিলা করা হয়েছে। তার মতে, কমিউনিটি-ভিত্তিক সেবা জোরদার, একই সফরে একাধিক সেবা প্রদান এবং ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তবুও প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দারা নিজেদের বিচ্ছিন্ন ও অসহায় মনে করছেন। মুলাঞ্জের তরুণী মা তেনদাই কাওসি বলেন, অনেক নারী এখন গ্রামে গর্ভধারণ করছেন কোনো নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা ছাড়াই। এতে শুধু পরিবার নয়, দেশের ভবিষ্যৎও ঝুঁকিতে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যকর্মী ও কমিউনিটি নেতারা দ্রুত বিকল্প অর্থায়ন ও টেকসই সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে মালাউইয়ের মায়েরা প্রয়োজনীয় সেবা থেকে আর বঞ্চিত না হন।
















