ওয়াশিংটন ডিসিতে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ ড্র অনুষ্ঠানের মঞ্চে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে নতুন “ফিফা শান্তি পুরস্কার” তুলে দেন, তখন শুধু করতালি নয়, বিশ্বজুড়ে উঠতে থাকে নানান প্রশ্ন। যে সংস্থা বছরের পর বছর মাঠে রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শনের জন্য খেলোয়াড়দের জরিমানা ও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, সেই সংস্থাই এবার রাজনীতির সবচেয়ে বিতর্কিত চরিত্রদের একজনকে শান্তির প্রতীক বলে সম্মান জানাল।
সমালোচকদের মতে, পুরস্কারটি এমন এক সময়ে দেওয়া হয়েছে, যখন এর ঠিক আগের দিনই ট্রাম্প প্রশাসন ক্যারিবীয় অঞ্চলে এক প্রাণঘাতী বিমান হামলা চালায়। সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও মানবাধিকার কর্মী ক্রেইগ মোকিবার একে “লজ্জাজনক” আখ্যা দিয়ে বলেন, এই পুরস্কার মূলত গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রশ্নে ফিফার নীরবতা ও ট্রাম্পের ভূমিকা আড়াল করার একটি প্রচেষ্টা।
ফুটবল ও রাজনীতিকে আলাদা রাখার কথা বললেও, ইনফান্তিনো মঞ্চে দাঁড়িয়ে ট্রাম্পের প্রশংসায় মুখর হন। তিনি বলেন, “আমাদের এমন নেতা চাই, যে মানুষের কথা ভাবেন, নিরাপদ পৃথিবী চান, সবাইকে এক করতে চান।” তার মতে, ট্রাম্প এই পুরস্কারের “যোগ্য” প্রথম প্রাপক।
অন্যদিকে ট্রাম্প নিজেও এই সম্মানকে তাঁর জীবনের অন্যতম বড় স্বীকৃতি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আবার দাবি করেন, তাঁর নেতৃত্বে বিশ্ব এখন আগের চেয়ে “অনেক বেশি নিরাপদ”, এবং তাঁর ভূমিকার কারণে বহু যুদ্ধ থেমেছে, লাখো প্রাণ বেঁচেছে। একইসঙ্গে তিনি পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়কার নীতির সমালোচনাও করতে ছাড়েননি।
তবে এই পুরস্কার ঘিরে কটাক্ষের ঝড় থামেনি। ফুটবল সাংবাদিক জ্যাক লোয়ি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “ট্রাম্পকে শান্তির পুরস্কার দেওয়া মানে লুইস সুয়ারেজকে কামড় না দেওয়ার জন্য পুরস্কার দেওয়া।” অনেকের মতে, এটি ছিল ফুটবল সংস্থার নৈতিক অবস্থানের সম্পূর্ণ বিপরীত পদক্ষেপ।
ইনফান্তিনো অতীতে বলেছিলেন, খেলাধুলাই মানুষের মাঝে ঐক্যের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম, এবং খেলাধুলার রাজনীতিমুক্ত থাকা জরুরি। কিন্তু দুই বছর পর তিনি যে সিদ্ধান্ত নিলেন, তা সেই বক্তব্যের সঙ্গে খাপ খায় না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
আল-জাজিরার পক্ষ থেকে ফিফার কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও সংস্থাটি কোনো জবাব দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট পার্টিসহ বহু মানবাধিকার সংগঠন এই পুরস্কারের সমালোচনা করে বলেছে, এটি এক ধরনের “কল্পিত সম্মান”, যা বিশ্ববাসীর কাছে বিভ্রান্তিকর বার্তা দেয়।
ট্রাম্পের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। সমালোচকেরা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তাঁর আমলে সামরিক খরচ বৃদ্ধি, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নির্দেশ, ইসরায়েলে অব্যাহত অস্ত্র সরবরাহ, ক্যারিবীয় অঞ্চলে নৌযানে বিমান হামলা, এবং নিজ দেশে অভিবাসনবিরোধী অভিযান—all মিলিয়ে তাঁর শান্তির মুখোশকে অনেকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মানতে নারাজ।
সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা মোকিবার বলেন, “ফিফা নিয়ম অনুযায়ী কাদাময় মাঠে খেলা হয় না। কিন্তু এখন ফিফাকে যে পথে নেওয়া হচ্ছে, তা যেন রক্তমাখা মাঠে খেলার সমান।”
















