ক্যারিবিয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ছে, শব্দের উত্তাপ পুড়িয়ে দিচ্ছে কূটনীতির আকাশ। আর তার মাঝেই এক অদৃশ্য আতঙ্ক—ভেনেজুয়েলায় কি তবে আসন্ন মার্কিন হামলা? লাতিন আমেরিকার বাতাস যেন এখন আরও ভারী, আরও সন্দেহাতুর।
সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ২১টি ভেনেজুয়েলীয় নৌযানে হামলা চালিয়েছে, দাবি করেছে সেগুলো নাকি মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত। নিহত হয়েছে কমপক্ষে ৮৭ জন। অথচ কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেনি ওয়াশিংটন, আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন—কোকেন বা অন্যান্য মাদকের প্রধান উৎস ভেনেজুয়েলা নয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনো বলছেন স্থল অভিযানের কথা ভাবছেন না, আবার কখনো সেই সম্ভাবনা উড়িয়েও দিচ্ছেন না। তবে CIA–কে তিনি ইতোমধ্যে কার্যক্রমের অনুমতি দিয়েছেন। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য একটাই—তাকে সরিয়ে ক্ষমতাসীন গঠনতন্ত্র বদলে ফেলা। তাঁর ভাষায়, ভেনেজুয়েলা লড়াই করবে, মাথা নত করবে না।
মার্কিন হামলা কিভাবে হতে পারে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনা প্রায় নেই। আকাশ ও সমুদ্র পথে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলাই হতে পারে প্রথম ধাপ। বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী জাহাজ USS Gerald Ford ইতোমধ্যেই ক্যারিবিয়ান সাগরে অবস্থান করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, কার্টেল বা মাদকচক্রের বিরুদ্ধে অভিযানের নাম করে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করা সহজ হবে, এবং আন্তর্জাতিকভাবে এর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠাও তুলনামূলক সুবিধাজনক।
তবে, যতই উত্তেজনা বাড়ুক, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় ইরাক-শৈলীর আক্রমণ চালাবে—এমন সম্ভাবনা কার্যত শূন্য। কারণ, শত শত যুদ্ধবিমান ও হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে অবরোধ, দখলদারি, রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে ফেলা—এই অলিখিত মূল্য ওয়াশিংটন এখন বহন করতে প্রস্তুত নয়।
আঘাত এলে ভেনেজুয়েলার কী অপেক্ষা করছে
অনেকে মনে করছেন, সামান্য আঘাতও ভেনেজুয়েলায় অস্থিরতার দরজা খুলে দেবে—যেন প্যান্ডোরার বাক্স উন্মুক্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সশস্ত্র বাহিনী কিংবা বিভিন্ন অপরাধচক্র নিজেদের এলাকা দখলে নামতে পারে।
রাজনৈতিক বিরোধীরা বরং আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারেন। কারণ, তাদের হাতে অস্ত্র নেই, সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে তাদের কোনো শক্তিশালী ঘাঁটি নেই। আর বিদেশি হামলা হলে শাসকগোষ্ঠী সাধারণত জাতীয়তাবাদের ঢেউ তুলতে সক্ষম হয়—এটা বারবার দেখা গেছে বিশ্বের নানা প্রান্তে।
মাদুরো সরকার আক্রমণের সম্ভাবনাকে সার্বভৌমত্বের ওপর আগ্রাসন হিসেবে বর্ণনা করছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী দিওসদাদো কাবেলো বলেন, “ওরা ভাবে, কয়েকটা বোমা ফেলেই সবাইকে নতিজান করবে? ভেনেজুয়েলায়?” মাদুরোও বলছেন, “আমরা শান্তি চাই—কিন্তু তা দাসের শান্তি নয়, উপনিবেশের শান্তি নয়।”
মার্কিন কৌশলের ভেতরের ছবি
সম্ভাব্য আক্রমণের আগেই যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনীকে দ্বিধাগ্রস্ত করতে চাইতে পারে—এমন ধারণা বিশ্লেষকদের। ১৯৯১ সালের ‘ডেজার্ট স্টর্ম’ অভিযানে যেমন কিছু ইরাকি ইউনিটকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল—যদি তারা যুদ্ধ না করে ব্যারাকে থাকে, তবে তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে না।
কিন্তু ভেনেজুয়েলায় মাদুরো ইতোমধ্যে সেনাবাহিনী থেকে ভিন্নমতকারীদের ছেঁটে ফেলেছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যতই সংকেত পাঠাক, প্রতিরোধের সম্ভাবনা রয়েই যায়।
সশস্ত্র বাহিনী কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে তা অনেকটা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের বার্তার ওপর—উদাহরণস্বরূপ: তারা কি বলবে, ‘পদ-মর্যাদা থাকবে’, নাকি ইরাকে বাথ পার্টি উৎখাতের মতো সম্পূর্ণ পুনর্গঠন করতে চাইবে? যদি সেনাবাহিনীকে প্রান্তিক করা হয়, দেশে বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট সংঘাতের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
সাধারণ মানুষ কোথায় দাঁড়াবে
ভেনেজুয়েলাবাসী ইতোমধ্যেই দীর্ঘ অর্থনৈতিক বিপর্যয়, মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য ও ওষুধ–সংকট, বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা—সবকিছুর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশজুড়ে প্রায় ৭.৯ মিলিয়ন মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। এই শ্বাসকষ্টের পরিস্থিতিতে আগুনের ওপর আগুন ছড়াবে একটি মার্কিন হামলা।
একদিকে সরকারের প্রতি অবিশ্বাস, অন্যদিকে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের প্রতি ভয়—এই দুইয়ের মাঝখানে জনমত খুবই জটিল, শহর–গ্রাম, শ্রেণি–পেশা, রাজনৈতিক পরিচয়—সব ভেদরেখায় বিভক্ত।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
চীন ও রাশিয়া—ভেনেজুয়েলার দুই বড় কৌশলগত অংশীদার। চীন প্রকাশ্যে সমর্থন দেবে, যদিও বাস্তবিক সামরিক ভূমিকা সীমিত হতে পারে। রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ, অস্ত্র বিক্রি ও গোয়েন্দা সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। তারা সামরিক পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে পারে।
তবে যতই আগুন জ্বলে উঠুক, আন্তর্জাতিক মিত্ররা কূটনীতির ভাষায় মাদুরোর পাশে দাঁড়াবে—এটাই বিশ্লেষকদের অভিমত।
অঞ্চলজুড়ে আরও বিস্তৃত আগুনের ঝুঁকি
ট্রাম্প সম্প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন—যে দেশগুলো মাদক উৎপাদন করে, সেগুলিও হতে পারে মার্কিন লক্ষ্যবস্তু। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন কলম্বিয়ার নাম। ফলে এই আগ্রাসী নীতি একটি নতুন টেমপ্লেটে পরিণত হতে পারে—যেখানে অঞ্চলজুড়ে রাজনৈতিক সংকটকে “নার্কো–সন্ত্রাসবাদ” হিসেবে চিহ্নিত করে সামরিক পদক্ষেপের বৈধতা খোঁজা হবে।
এভাবে সামরিকীকরণের পথে হাঁটলে আন্তর্জাতিক আইনের ওপর থাকা নাজুক নিয়ন্ত্রণ আরও দুর্বল হয়ে পড়বে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন বহু বিশেষজ্ঞ।
















