৭০ বছরের পুরোনো ‘অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫৬’ বাতিল করে নতুন ‘অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন, ২০২৫’ প্রণয়ন করছে সরকার। পণ্যের তালিকা বাড়ানো, বাজারে হস্তক্ষেপ ক্ষমতা স্পষ্টকরণ, মজুতদারি–কারসাজি প্রতিরোধ ও ভোক্তা সুরক্ষায় আইনটি বড় পরিবর্তন আনবে।
পাকিস্তান আমলের সাত দশক পুরোনো ‘অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫৬’ পরিবর্তন করে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাজার কাঠামো, পণ্যের বৈচিত্র্য, সংকট ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিভিত্তিক বাণিজ্য পরিচালনার সঙ্গে পুরোনো আইনের অসামঞ্জস্য দূর করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
৩ ডিসেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মশালায় ‘অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন, ২০২৫’-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। নতুন আইনে ‘নিয়ন্ত্রণ’ শব্দটি বাদ দেওয়া হলেও উৎপাদন, আমদানি, সরবরাহ, সংরক্ষণ থেকে বিক্রি পর্যন্ত বাজারে সরকারের হস্তক্ষেপ ক্ষমতা আরও স্পষ্টভাবে বহাল রাখা হয়েছে। অর্থাৎ বাজার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে যে প্রশাসনিক ক্ষমতাগুলো প্রয়োজন—তা আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগের সুযোগ মিলবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২১ সালেই আইন সংশোধনের উদ্যোগ শুরু হয়। ব্যাপক আলোচনা, ব্যবসায়ী–সংগঠন, বাজারসংশ্লিষ্ট পক্ষ, আইন বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকদের মতামত নিয়ে ২০ ধারা ও একটি তফসিলসহ পূর্ণাঙ্গ খসড়া তৈরি করা হয়েছে। ভাষাগত মানোন্নয়নের জন্য খসড়া পাঠানো হয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষে; তারা পর্যালোচনা শেষে তা ফেরত পাঠিয়েছে।
নতুন আইনে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকা বিস্তৃত হচ্ছে। ২০১২ সালে ঘোষিত ১৭ পণ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে ধান, চাল, গম, আটা ও আলু। বিদ্যুত্কেও প্রথমবারের মতো সর্বজনীন গুরুত্বের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। কর্মকর্তাদের মতে, বাজারে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি, অতিরিক্ত মুনাফা বা সরবরাহ বিঘ্ন দেখা দিলে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা বাড়বে। প্রয়োজনে যেকোনো পণ্যের আমদানি উন্মুক্ত বা সীমিত করতেও পারবে সরকার।
পণ্যতালিকা প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তালিকায় অন্তর্ভুক্তি মানে মূল্য নির্ধারণ, উৎপাদন অনুসরণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের ভূমিকা জোরালো হওয়া। তবে সাবান, টুথপেস্ট, ডিটারজেন্ট ও কীটনাশকের মতো দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্য তালিকায় না থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ক্যাবের সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, বোতলজাত পানি, স্যানিটারি ন্যাপকিন, মৎস্য খাদ্য, সাবান–ইত্যাদি পণ্যও তালিকায় যুক্ত হওয়া উচিত। তার মতে, “নতুন আইন প্রয়োজন হলেও সবচেয়ে জরুরি হলো এর কার্যকর প্রয়োগ—নয়তো এটি কাগুজে আইন হয়ে থাকবে।”
শাস্তির বিধানেও পরিবর্তন এসেছে। পূর্বের খসড়ায় ৩ বছরের কারাদণ্ডের প্রস্তাব থাকলেও তা কমিয়ে ২ বছর করা হয়েছে। জরিমানার অঙ্ক কয়েকটি ধারায় বাড়ানো হয়েছে, যাতে আইনের প্রয়োগ আরও কার্যকর হয়। তবে বিচারকার্য আদালতে প্রশ্ন করা যাবে না—এমন ধারা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বাদ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান জানান, খসড়া আইনটি নির্বাচনের আগেই অধ্যাদেশ আকারে আনা হবে না। নতুন সরকারই এটি সংসদে পাশ করবে। তার মতে, “বাজারে স্থিতিশীলতা ও ভোক্তা অধিকার রক্ষায় আধুনিক বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন আইন অপরিহার্য।”
নতুন আইন কার্যকর হলে অতি প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মজুত, মূল্য কারসাজি, সরবরাহ বিঘ্ন—এসব ক্ষেত্রে সরকারের হস্তক্ষেপ দ্রুততর ও আরও দৃশ্যমান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাজার নিয়ন্ত্রণ থেকে আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনা—এ পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
















