জাপানের উত্তরাঞ্চলের জাও পর্বতশৃঙ্গ—যেখানে প্রতি শীতেই প্রকৃতি নির্মাণ করে এক অলৌকিক দৃশ্য। বরফে মোড়া ফার গাছগুলো রূপ নেয় অদ্ভুত সব ভাস্কর্যে, যেগুলোকে স্থানীয়রা বলে ‘জুহিয়ো’, আর বিশ্ব চেনে ‘স্নো মনস্টার’ নামে। যেন বরফের নিঃশব্দ রাজ্যে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো প্রেতাত্মা, ঝড়-হাওয়ার হাত ধরে জন্ম নেওয়া এক অদ্বিতীয় বিস্ময়।
কিন্তু এই বিস্ময়ের শরীরে আজ লেগেছে ক্ষয়ের দাগ। প্রকৃতির এই শিল্পকর্ম ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে উঠছে—গলে যাচ্ছে তুষারের স্তর, ক্ষয়ে যাচ্ছে তাদের জন্মদাতা বন।
জুহিয়ো গড়ে ওঠে এক বিরলতম পরিবেশে—যখন তীব্র শীতের পশ্চিমা বাতাস ভাসিয়ে আনে অতিশীতল জলকণা, যা আঘাত করতেই জমে যায় আওমোরি তোদোমাতসু ফার গাছে। স্তর জমে জমে তৈরি হয় ‘শ্রিম্প টেইল’ নামে পরিচিত রাইম বরফ, আর সেখান থেকেই তৈরি হয় তুষার দানবদের অনন্য ভঙ্গিমা।
জাও পর্বতের জুহিয়ো বিশ্বে প্রায় অদ্বিতীয়। বছরে হাজার হাজার পর্যটক এই পর্বতে ছুটে আসেন শুধু এই দৃশ্য দেখতেই। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে—তুষার দানবরা আর আগের মতো শক্তপোক্ত নেই।
গবেষক ফুমিতাকা ইয়ানাগিসাওয়া ও তার দল ১৯৩৩ সাল থেকে তোলা একই কোণের ছবির তুলনা করে দেখেছেন—জুহিয়োর ব্যাপক সংকোচন ঘটেছে। চল্লিশের দশকে যেগুলো ছিল পাঁচ-ছয় মিটার মোটা, যুদ্ধোত্তর সময়ে সেটি কমে তিন মিটার। ২০১৯-এর পর বহু জুহিয়ো অর্ধমিটারেরও কম, অনেকগুলো কেবল সরু স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
এর কারণ দুটি—উষ্ণায়ন আর বন ধ্বংস। ২০১৩ সালে ভয়াবহ মথ আক্রমণে ফার গাছগুলোর পাতা ঝরে পড়ে, আর ২০১৫ সালে বার্ক বিটল পোকা আঘাত হানে দুর্বল গাছের কাণ্ডে। ইয়ামাগাতা প্রদেশ জানিয়েছে—কেবল এই অঞ্চলে মারা গেছে প্রায় ২৩ হাজার ফার গাছ। গাছ কমলে বরফ জমার জায়গাও কমে যায়।
অন্যদিকে, শীতকালের তাপমাত্রা গত ১২০ বছরে প্রায় ২ ডিগ্রি বেড়েছে। ফলে জুহিয়ো তৈরি হওয়া অঞ্চল ক্রমেই উঁচুতে সরে যাচ্ছে, এবং শীতকালে এগুলো টিকে থাকার সময়ও কমে এসেছে।
পরিবেশবিদরা বলছেন—যদি উষ্ণায়ন এভাবে বাড়তেই থাকে, শতাব্দীর শেষ দিকে হয়তো উষ্ণ শীতে একটিও তুষার দানব আর তৈরি হবে না।
এই ভয়াবহ হুমকির মুখে ইয়ামাগাতা প্রদেশ ২০২৩ সালে গঠন করেছে ‘জুহিয়ো পুনর্জাগরণ পরিষদ’। গবেষক, ছাত্র, স্থানীয় মানুষ সবাইকে নিয়ে চলছে দীর্ঘমেয়াদি বন পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা।
স্থানীয় পর্যটনের বড় ভরসা এই তুষার দানব। হোটেল, দোকান, রেস্তোরাঁ—সবই টিকে আছে তাদের কল্যাণে। তাই তাদের হারিয়ে যাওয়া মানে স্থানীয় অর্থনীতিরও ভেঙে পড়া।
২০১৯ সাল থেকে পর্বতের নিচের ঢাল থেকে ছোট ছোট ফার চারা তুলে এনে রোপণ করা হচ্ছে শীর্ষে। কিন্তু এই গাছ বড় হতে লাগে ৫০ থেকে ৭০ বছর—অতএব এই লড়াই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চালিয়ে যেতে হবে।
মুরায়ামা শহরের এক প্রযুক্তি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও যুক্ত হয়েছে এই অভিযানে। তারা চারা সংগ্রহ, চাষাবাদ, কৃত্রিমভাবে চারাগাছ উৎপাদনের উপর গবেষণা করছে। কোনো বৃষ্টিতে বপন করা বীজ অঙ্কুরিত হলে তাদের মুখে ফুটে ওঠে আনন্দ, আবার কোনো রাতে ইঁদুর খেয়ে ফেললে দুঃখ ছুঁয়ে যায় মন—এ যেন প্রকৃতি রক্ষার পথে এক নতুন প্রজন্মের প্রতিশ্রুতি।
পর্বতের চূড়ায় নষ্ট হয়ে যাওয়া গাছ দেখে শিক্ষার্থী কানন তানিয়াইয়ের মনেও বেদনার ঢেউ উঠেছে। তবুও তাদের স্বপ্ন—পর্বত আবার প্রাণ ফিরে পাক, জুহিয়োর ঐতিহ্য পরের প্রজন্মের কাছে হস্তান্তরিত হোক।
তানিয়াই বলেন, “এদের স্নো মনস্টার বলা হয়, কারণ পৃথিবীতে আর কিছুই এদের মতো নয়। আমি চাই—বিশ্ব যেন ওদের দেখে, অনুভব করে জাপানের প্রকৃতির এই বিস্ময়।”
জাও পর্বতের সেই নীরব দাঁড়িয়ে থাকা দানবরা হয়তো আজ ক্ষয়ে যাচ্ছে, তবুও মানুষের অটল চেষ্টা যেন তাদের বরফমাখা দেহে আবার ফিরিয়ে আনে জীবন, ফিরিয়ে আনে সেই বিস্ময়ের নিশ্বাস।
















