সিরিয়ার ভাঙাচোরা ভূখণ্ডে, যুদ্ধের ক্ষতচিহ্নে মোড়া পথ পেরিয়ে, প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রতিনিধিদল পৌঁছেছে দেশটিতে—ঠিক এমন এক সময়ে, যখন দীর্ঘ দুই দশকের শাসক বাশার আল-আসাদের পতনের প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে দেশটি ইতিহাসের নতুন পাতায় পা দিতে চলেছে।
লেবানন সীমান্তের জদাইদেত ইয়াবুস ক্রসিং দিয়ে প্রবেশ করা প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানায় সিরিয়ার নতুন প্রশাসন। রাষ্ট্রীয় সংস্থা সানা জানায়, সফরকারী সদস্যরা নতুন সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ সংঘাতোত্তর বাস্তবতা নিয়ে কাজ করা গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে বৈঠক করবেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা বিধ্বস্ত রাজধানী দামেস্কের যুদ্ধবিধ্বস্ত জোবার উপশহরে গিয়ে দেখেন একসময় মানুষের কোলাহলে ভরা জনপদের ছাইভস্ম।
প্রতিনিধিদলের সূচিতে রয়েছে সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শরাআর সঙ্গে সাক্ষাৎ। এই সফর শেষে তারা লেবাননেও যাবেন, যেখানে বছরখানেক আগে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতির নাজুক বাস্তবতা এখনও ঠুনকো সুতোয় ঝুলে আছে।
দামেস্ক থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক আসেদ বাইগ জানান, এই সফর সিরিয়ার ইতিহাস-সংস্কৃতির ক্ষত-বিক্ষত দিকগুলো দেখানোরও একটি সুযোগ। ধ্বংসস্তূপ পেরিয়েও যে একটি দেশ নতুন করে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে—এই সফর সেই গল্পটিই যেন নীরবে তুলে ধরে।
সফরকে সিরিয়ার মানুষ ইতিবাচক চোখে দেখছেন। কারণ এটি জানিয়ে দেয়—আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিরতে দেশটির প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। আরব প্রতিবেশী থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত—অনেকেই এখন দেশটির পুনর্গঠনের পথে সহযোগিতার বার্তা দিচ্ছে।
তার পরও মানবিক সংকটের গভীরতা রয়ে গেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ এখনও গৃহহীন, বহু অঞ্চল ধ্বংসের ভারে কাতর। জাতিসংঘ এই সফরে মানবিক সহায়তা এবং পুনরুদ্ধারের অগ্রাধিকারগুলো নিয়েও কথা বলবে।
আল-আসাদের পতনের পর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার পাঁজর থেকে সদ্য মুক্তি পেয়েছেন প্রেসিডেন্ট আল-শরাআ—যিনি বিদ্রোহী থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার অস্বাভাবিক যাত্রায় দেশকে টেনে তুলেছেন এক অগ্নিগর্ভ ভূখণ্ড থেকে। কিন্তু তার সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করা। সদ্য হোমসের দক্ষিণে এক বেদুইন দম্পতি খুন হওয়ার ঘটনার পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল, যা নিরাপত্তা বাহিনীর হস্তক্ষেপে শান্ত হয়।
এর পাশাপাশি দেশটিকে সহ্য করতে হচ্ছে ইসরায়েলের বাড়তে থাকা সীমান্ত লঙ্ঘন। গত সপ্তাহেই বেইত জিন্ন শহরে ইসরায়েলি অভিযানে নিহত হয় ১৩ জন। সিরিয়ার অভিযোগ—তারা সংঘাতে যেতে চায় না, অথচ তাদের ভূমি দখল করে ইসরায়েল একটি নতুন ‘বাফার জোন’ তৈরির পথে হাঁটছে।
ইসরায়েল-সিরিয়া নিরাপত্তা চুক্তি নিয়ে কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলছে, কিন্তু তাতে তেমন সাফল্য নেই। সিরিয়ার গোলান উচ্চভূমি দখলের পুরোনো ক্ষত যেন নতুন করে রক্তাক্ত হয়ে উঠছে।
স্লোভেনিয়ার রাষ্ট্রদূত স্যামুয়েল জবোগার—যিনি UNSC–র বর্তমান সভাপতি—বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ছয় বছর পর নিরাপত্তা পরিষদের এই সফর, আর সিরিয়ায় প্রথম। তার ভাষায়, এই সময়ে এমন সফর অত্যন্ত দরকার, যখন সিরিয়া পরিবর্তনের পথে প্রথম পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং লেবাননের যুদ্ধবিরতি প্রতিদিন বিপদের মুখোমুখি হচ্ছে।
জাতিসংঘ জানতে চায় কীভাবে সিরিয়া তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সাজাবে, কীভাবে আল-শরাআর সরকার বহুজাতিক সমাজে অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন প্রতিষ্ঠা করবে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্তেফানে দুজারিক বলেন, তারা আশা করেন এই সফর জাতিসংঘ ও সিরিয়ার মধ্যকার আস্থার সেতুটি আবার গড়ে তুলবে।
অন্যদিকে সিরিয়া চায় আন্তর্জাতিক সমর্থন, মানবিক সহায়তা এবং দেশ পুনর্গঠনের নিশ্চয়তা। দুই পক্ষের এই প্রত্যাশার মাঝেই যেন জন্ম নিচ্ছে যুদ্ধশেষের এক নতুন ভোর—যেখানে ধ্বংসের স্মৃতি আছে, কিন্তু তবু আশার আলো কাঁপছে ভগ্ন দেয়ালের ফাঁকে।
















