পূর্ব তিমুরের লসপালোসে দুপুরটা ছিল নিস্তব্ধতার, মুরগির ডানা ঝাপটানো আর দূর থেকে ভেসে আসা পর্তুগিজ রেগেটনের সুরে ভরা। কিন্তু এই শান্ত ছবির পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর ক্ষত—১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরের সেই দিন, যখন ইন্দোনেশীয় সেনারা আকাশ চিরে প্যারাশুটে নেমে এসেছিল, আর শুরু হয়েছিল অন্ধকারতম এক অধ্যায়।
সেই দিনের স্মৃতি এখনো তাড়া করে বের্তা দোস সান্তোসকে। শিশু বয়সেই তাকে পাহাড়ে লুকাতে হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেনাদের হাতে ধরা পড়তে হয়। মাত্র নয় বছর বয়সে তাকে ধর্ষণের শিকার হতে হয়; তার মা হেলেনাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যৌন দাসত্বের অমানবিক বন্দিত্বে। লসপালোসে ওই নিদারুণ ঘটনা ছিল ইন্দোনেশিয়ার ২৪ বছরের নির্মম দখলে প্রবেশের সূচনা।
এই দখলদারিত্বে রুজু হয়েছিল হত্যাযজ্ঞ, গণঅনাহার, নারী নির্যাতন, নির্বিচার বন্দিত্ব আর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া হাজারো প্রাণের শোকগাঁথা। বছরের পর বছর পাহাড়ের গভীরে অস্ত্র হাতে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন দেশটির সাহসী যোদ্ধারা। তাঁদের একজন ছিলেন সাবিকা বেসি কুলিত, যিনি ‘মেটাল স্কিন’ নামে পরিচিত। ২৪ বছর তিনি জঙ্গলে লড়ে গেছেন, ক্ষুধা আর গোলাবারুদের অভাবকে সঙ্গী করে। নিহত ইন্দোনেশীয় সেনাদের কাছ থেকে অস্ত্র, খাবার, এমনকি জুতো সংগ্রহ করেই চলত তাঁদের সংগ্রাম।
১৯৮০-এর দশক ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নজর ছিল না, দেশের ভেতর যোগাযোগ ছিল বিচ্ছিন্ন। ফালিন্তিল যোদ্ধারা বছরে একবার রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে চিঠি পেতেন। সেই সময় অনাহার আর গণহত্যায় মারা গিয়েছিল প্রায় দুই লাখ মানুষ—তিমুর জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে হওয়া গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেন ৭৮ শতাংশ মানুষ।
কিন্তু স্বাধীনতার আনন্দের ছায়ায় রয়ে গেছে বহু অনুচ্চারিত যন্ত্রণা। লসপালোসের ক্রিস্টিনা সিতির মতো বহু মানুষ জন্ম থেকেই বয়ে বেড়িয়েছেন অপমানের দাগ। ইন্দোনেশীয় সেনার জোরপূর্বক সম্পর্কে জন্ম হওয়া বলে তাকে ‘ইন্দোনেশীয় শিশু’ বলে অপদস্থ করা হতো। তার মা নিজের ভাইদের বাঁচাতে বাধ্য হয়েছিলেন একজন কমান্ডারের সঙ্গে বিয়েতে। তার দ্বিতীয় সন্তানকে তুলে নেওয়া হয়েছিল জোর করে—একজন ইন্দোনেশীয় সেনার হাতে।
দেশের বিভিন্ন গ্রামে রয়েছে এমন অসংখ্য নারীর গল্প, যাদের জীবন দখলদারিত্বের আঁধারে বিধ্বস্ত হয়েছিল।
যে অপরাধগুলো সংঘটিত হয়েছিল, তাদের কতজন ভুক্তভোগী তার সঠিক সংখ্যা কেউ জানে না। আর অপরাধীদের বিচার হয়েছে খুবই অল্প। ২০০৫ সালে প্রকাশিত সত্য ও পুনর্মিলন কমিশনের রিপোর্টে নির্যাতন, গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিস্তৃত চিত্র উঠে আসে। তবুও, অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার প্রশ্নে আজও অন্ধকার ঘনিয়ে আছে।
ইন্দোনেশিয়ার ভেতরে বিচারপ্রক্রিয়া এগোয়নি রাজনৈতিক অনীহা আর প্রভাবশালী যুদ্ধাপরাধীদের ‘নায়ক’ হিসেবে দেখা হওয়ার কারণে। ১৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও দণ্ডিত হয়েছিলেন মাত্র একজন প্রো-ইন্দোনেশীয় মিলিশিয়া নেতা।
অন্যদিকে, পূর্ব তিমুরের বর্তমান সরকার ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। অর্থনীতি, বাণিজ্য আর আঞ্চলিক সহযোগিতা—সব ক্ষেত্রে জাকার্তার সমর্থন দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবুও রয়ে গেছে মানুষের হৃদয়ে অসংখ্য প্রশ্ন। কতটা ন্যায়বিচার প্রয়োজন, কতটা ক্ষমা যথেষ্ট—তার উত্তর সবার কাছে এক নয়।
ক্রিস্টিনা সিতি মনে করেন, তার ব্যক্তিগত বেদনা বৃহত্তর যুদ্ধের ক্ষতির তুলনায় ক্ষুদ্র। তিনি ন্যায়বিচার চান না; চান শান্তি। অন্যদিকে, সাবিকা বেসি কুলিত ক্ষোভ লুকোতে পারেন না—দেশের বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে তার হতাশা গভীর। তিনি মনে করেন, পাহাড়ে যুদ্ধ করা মানুষরাই একে অপরের যন্ত্রণা বোঝেন।
বের্তা দোস সান্তোস বহু আগেই নিজের কষ্টকে মুক্ত করেছেন। তার ভাষায়, স্বাধীনতার যে আনন্দ জাতিকে দিয়েছে, তা তার ব্যক্তিগত যন্ত্রণা থেকেও বড়।
অর্ধশতক পেরিয়ে আজও পূর্ব তিমুর খুঁজে ফেরে ন্যায়বিচারের আলো—ছিন্নভিন্ন অতীতের ছায়া থেকে একদিন সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়ার আশায়।
















