দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ ও প্রাণহানি। চলতি বছর এ পর্যন্ত অন্তত ৯৫ হাজার ৪৫১ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন ২৯৫ জন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশে এখনো কোনো টিকার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। অথচ বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশে ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের অনুমোদন রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে ডেঙ্গুর টিকার অনুমোদন ও পরীক্ষামূলক প্রয়োগ (ট্রায়াল) শুরু করার তাগিদ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাতে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘ঢাকা মেইল’-এর এক প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি)-এর তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রধানত দুটি টিকা ব্যবহার করা হচ্ছে—জাপানের তাকেডা ফার্মাসিউটিক্যালসের ‘কিউডেঙ্গা’ (Qdenga) এবং ফরাসি কোম্পানি সানোফি পাস্টুরের ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’ (Dengvaxia)। সম্প্রতি ব্রাজিলে ‘বুটানটান-ডিভি’ নামের একক ডোজের একটি টিকার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারতের ড্রাগস কন্ট্রোলার জেনারেল ‘কিউডেঙ্গা’ টিকার অনুমোদন দেয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরেও এটি সহজলভ্য। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, পূর্বে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হননি এমন ব্যক্তিরাও (৪ বা ৬ বছর বয়সের উর্ধ্বে) কিউডেঙ্গা টিকা নিতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ কমিয়ে আনে।
বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ দিতে গিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমেদ জানান, প্রতিবেশী দেশ ভারতে টিকার ট্রায়াল ও ব্যবহার শুরু হওয়ায় একটি পথনির্দেশনা পাওয়া যাবে। তবে কেবল অন্য দেশের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে বাংলাদেশের নিজস্ব ভৌগোলিক ও শারীরিক উপযোগী উপাত্ত পেতে দেশেই টিকার ট্রায়াল চালু করা উচিত। এ জন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সরকারি অর্থ বরাদ্দের তাগিদ দেন তিনি।
অন্যদিকে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন টিকার মান ও সুরক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এক দশক আগে ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রে টিকার নিরাপত্তাজনিত জটিলতায় বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ফলে দেশে কোনো ডেঙ্গু ভ্যাকসিন অনুমোদনের আগে সেটি সম্পূর্ণ নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড উত্তীর্ণ কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এ বিষয়ে জানান, দেশে ডেঙ্গু টিকা চালুর বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। তবে বর্তমানে বাজারে বিদ্যমান টিকাগুলো এখনো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক শতভাগ কোয়ালিফাইড বা আন্তর্জাতিকভাবে সর্বজনগৃহীত নয়। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তার প্রমাণ ছাড়া সাধারণ মানুষের ওপর কোনো ভ্যাকসিন প্রয়োগের ঝুঁকি সরকার নেবে না।
একই ইস্যুতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, সরকার ডেঙ্গুর টিকা চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। টিকার উচ্চমূল্য ও কার্যকারিতা বিবেচনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফ এবং বৈশ্বিক টিকা জোট ‘গ্যাভি’-র সঙ্গে নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুসরণ করেই এ বিষয়ে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।


























