যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও অভিবাসন নীতিতে কড়া অবস্থান নিয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাতে তিনি ঘোষণা করেছেন, বিশ্বের সব ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড’ দেশ থেকে অভিবাসন ‘স্থায়ীভাবে’ স্থগিত করা হবে। তাঁর এই ঘোষণা এসেছে ওয়াশিংটন ডিসিতে দুই ন্যাশনাল গার্ড সদস্যকে গুলি করার ঘটনার পর, যেখানে সন্দেহভাজন হিসেবে একজন আফগান নাগরিকের নাম উঠে এসেছে। তাদের একজন পরে মারা গেছেন।
ট্রাম্প নিজের সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, তিনি এমন সব দেশ থেকে অভিবাসন থামিয়ে দেবেন, যেগুলোকে তিনি ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন, যদিও কোন দেশগুলো এই আওতায় পড়বে তা তিনি স্পষ্ট করেননি। সাধারণভাবে এ শব্দটি উন্নয়নশীল বা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
তিনি আরও বলেছেন, যারা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য “সম্পদ নয়” বা যারা “দেশকে ভালোবাসতে অক্ষম”, তাদের দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, অ-নাগরিকদের জন্য ফেডারেল সুবিধাও বন্ধ করে দেওয়া হবে।
ইতিমধ্যে ১২টি দেশের নাগরিকদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা এবং আরও কয়েকটি দেশের ওপর সীমিত প্রবেশাধিকার আরোপ করে রেখেছে তাঁর প্রশাসন। বছরের শুরু থেকেই কঠোর ভ্রমণ নীতি যুক্তরাষ্ট্রের দরজাকে সংকীর্ণ করে তুলেছে।
ওয়াশিংটন ডিসির গুলির ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে ২৯ বছর বয়সী আফগান নাগরিক রাহমানাউল্লাহ লাকানওয়ালকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার পরই ট্রাম্প এই ঘটনাকে “সন্ত্রাসী হামলা” বলে মন্তব্য করেন এবং নির্দেশ দেন, আফগানিস্তান থেকে বিডেন প্রশাসনের সময় যারা যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে তাদের সবাইকে পুনরায় যাচাই করা হবে।
বৃহস্পতিবার ভোরে ইউএসসিআইএস ঘোষণা করে, আফগান নাগরিকদের সকল অভিবাসন আবেদন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। পরে সংস্থাটির প্রধান জানান, প্রেসিডেন্টের নির্দেশে এমন সব দেশের গ্রিন কার্ডধারীদের পর্যালোচনা শুরু হবে যেগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
চলতি বছরের জুনে ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ করে ১৯ দেশের তালিকা, যেগুলোর ওপর পূর্ণ বা আংশিক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ছিল। আফগানিস্তান, ইরান, ইয়েমেন, সোমালিয়া, সুদানসহ ১২টি দেশ ছিল সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার আওতায়। কিছু দেশ সীমিত ভ্রমণের অনুমোদন পেলেও পরিস্থিতি দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
তবে ‘স্থায়ী স্থগিত’ বলতে আইনে কী বোঝায়—তা স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি অস্পষ্ট শব্দ, যার আনুষ্ঠানিক শেকড় নেই, যা প্রশাসনকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করার সুযোগ দেয়।
এই অনিশ্চয়তা সবচেয়ে বেশি আঘাত করছে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অভিবাসী পরিবারগুলোকে। রিপোর্ট বলছে, নিষিদ্ধ দেশের মানুষেরা হয়তো আর তাদের বিদেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের দেখতেই পারবেন না। ভিসা নবায়নের জন্য দেশ ছাড়লে তারা ফিরতে নাও পারতে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই নীতি শুধু কাগজের নিয়ম নয়—এটি দীর্ঘ বিচ্ছেদ, অজানা অপেক্ষা এবং পরিবারগুলোর মাঝে গভীর উদ্বেগ তৈরি করবে। ইতিমধ্যে অনেক আবেদনকারীর প্রক্রিয়া স্থগিত, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কঠোর হচ্ছে, আর আবেদন নিষ্পত্তিতে সময় বাড়ছে।
অন্যদিকে গ্রিন কার্ডধারীদের ওপরও ঝড় নেমে আসতে পারে। যদিও আইন অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া গ্রিন কার্ড বাতিল করা যায় না, তবুও তাদের অতীত নথি যাচাই, নিরাপত্তা স্ক্রিনিং এবং অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের সম্ভাবনা বাড়ছে।
এ বছর ট্রাম্প প্রশাসন শরণার্থী প্রবেশেও ঐতিহাসিক নিম্নসীমা নির্ধারণ করেছে—মাত্র ৭৫০০ জন। এ ছাড়া বিডেন আমলে যেসব শরণার্থী যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে, তাদের প্রায় আড়াই লাখ আবেদন পুনরায় খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে শরণার্থী সংকট যখন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের এমন কঠোর নীতি মানবিক সংকট আরও গভীর করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার সংস্থাগুলো।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব ঘোষণা শুধু প্রশাসনিক নয়—এগুলো ভয় দেখানোর ভাষা, মানুষের হৃদয়ে অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে দেওয়া আর অভিবাসীদের মানবিক পরিচয়কে অস্পষ্ট করে দেওয়ার এক প্রচেষ্টা।
প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়—একটি দেশের নিরাপত্তা গড়তে কি ভয়ের প্রাচীরই শেষ ভরসা? নাকি মানবিক বোধের দরজাই একদিন নতুন আলো দেখাবে?
















