আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গণভোট আয়োজনের যে সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকার নিয়েছে, তা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। ইসি এবং নির্বাচন বিশ্লেষকদের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো উঠে এসেছে, তার পাশাপাশি এই দ্বৈত ভোটের সিদ্ধান্তে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও নানা আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

গণভোটের ঐতিহাসিক পটভূমি
এই গণভোটটি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া চতুর্থ গণভোট। এর আগে তিনটি গণভোট অনুষ্ঠিত হলেও সেগুলোর প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন এবং কোনোটিই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথে একযোগে হয়নি:
- প্রথম গণভোট (১৯৭৭): এটি ছিল রাষ্ট্রপতি আস্থা গণভোট। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নীতি ও কর্মসূচির প্রতি দেশের জনগণের আস্থা আছে কি না, তা জানতে এটি অনুষ্ঠিত হয়।
- দ্বিতীয় গণভোট (১৯৮৫): এটি ছিল সামরিক শাসনের গণভোট। রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে এই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
- তৃতীয় গণভোট (১৯৯১): এটি ছিল সাংবিধানিক গণভোট। ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের জন্য এই গণভোট আয়োজিত হয়।

পূর্ববর্তী গণভোটগুলোর মধ্যে ১৯৭৭ ও ১৯৮৫ সালের ফলাফল নিয়ে স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন উঠেছিল, তবে ১৯৯১ সালের গণভোটটি তুলনামূলকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল, যদিও সেই সময়েও ৩৫.২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। ৩৪ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই চতুর্থ গণভোট তাই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও জনসচেতনতার চ্যালেঞ্জ
দ্বৈত ভোটের সিদ্ধান্তের পর রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে:
- জুলাই সনদের সমর্থকরা: জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং জুলাই সনদের পক্ষভুক্ত দলগুলো এই দ্বৈত ভোটকে সংস্কারের দ্রুত বাস্তবায়ন এবং ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, এটি জনগণের ম্যান্ডেটকে আরও শক্তিশালী করবে।
- বিরোধীরা: অন্যদিকে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন বয়কটকারী প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো এই গণভোটের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত যেকোনো গণভোট বা নির্বাচন আয়োজন কেবল ক্ষমতার বৈধতা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া। তারা আশঙ্কা করছে, দুটি ভোট একসাথে হওয়ায় ভোটারদের মনোযোগ বিভক্ত হবে এবং গণভোটের জটিলতা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) মনে করছে, দুটি ব্যালট এবং ‘হ্যাঁ/না’ উত্তরের জটিল প্রক্রিয়া গ্রামীণ ও কম শিক্ষিত ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের মধ্যে গণভোটের চারটি জটিল বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করতে সময়স্বল্পতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইসির সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা এখন ব্যালট পেপার ছাপানো এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি শেষ করার পাশাপাশি ব্যাপক জনসচেতনতা কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা নিচ্ছেন। ভোটদান প্রক্রিয়া সহজ করতে ইসিকে এবারই প্রথম ভোটারদের জন্য দ্বৈত ব্যালট ব্যবহার ও সিল মারার বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও প্রচারণামূলক ভিডিও তৈরি করতে হবে।

ইসি’র অতিরিক্ত প্রস্তুতি
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের স্বীকারোক্তির পর ইসি দ্রুত তাদের প্রস্তুতিতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনছে:
- কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ: জাতীয় নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসারসহ সকল নির্বাচনী কর্মকর্তাদের গণভোটের অতিরিক্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তাদের দুটি ভিন্ন রঙের ব্যালট, দুটি ব্যালট বাক্স (যা এখনো নিশ্চিত নয়) এবং দুটি গণনা প্রক্রিয়া একসাথে পরিচালনার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
- নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা: ভোটকেন্দ্রে দীর্ঘ লাইন এবং শৃঙ্খলার অবনতি রোধ করতে ইসি এবার প্রতিটি কেন্দ্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েনের বিষয়টি বিবেচনা করছে। একইসাথে ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা (৪২,৭৬১টি) পুনর্বিবেচনা না হলেও, অতিরিক্ত ভোটকক্ষ তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যাতে প্রতি কক্ষে ভোটারের সংখ্যা হ্রাস করা যায়।
















