শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৫
বাংলাদেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়তেই জনসমক্ষে উঠে আসছে ভিন্নধর্মী মতামত। কবি, লেখক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক নির্বাচনী সংলাপে বলেন—বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন আহ্বান করা “বাংলাদেশকে বিপদের দিকে ঠেলে দেওয়ার সমান।”
সংলাপটি আয়োজন করে ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (এফএসডিএস)।
‘সাংবিধানিক যুক্তি কোথায়?’- উপদেষ্টা সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন
সংলাপে বক্তৃতা দিতে গিয়ে ফরহাদ মজহার বলেন, যদি অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ববর্তী সাংবিধানিক কাঠামোই অনুসরণ করে থাকে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—২০২৬ সালের নির্বাচন কোন সাংবিধানিক পরিপ্রেক্ষিতে চাওয়া হচ্ছে?
তিনি বলেন,
“যদি মনে করেন উপদেষ্টা সরকার শেখ হাসিনার সংবিধান মেনেছে, তাহলে ২০২৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ২০২৪ সালের নির্বাচনকে তো তারা অবৈধ বলেনি।”
তার বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল—অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে ক্ষমতায় এসেছে, সেই প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ‘গণ-অভ্যুত্থানভিত্তিক বৈধতা’ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, পুরানো সংবিধান বহাল রেখে সেই ক্ষমতার উৎস দুর্বল হয়ে গেছে।
‘আইন না মানলে বিশৃঙ্খলা’- গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা তুললেন তিনি
ফরহাদ মজহার আরো বলেন, যদি রাজনৈতিক দলগুলো আইন অমান্য করে নির্বাচন চাপিয়ে দেয়, তবে সেটি দেশের জন্য বিপজ্জনক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
তার ভাষায়,
“আইন না মানলে সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। আগামী দিনে সংঘাত তৈরি হবে। বাংলাদেশকে আমরা অত্যন্ত দ্রুতবেগে একটা বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছি।”
তিনি সতর্ক করেন – অবৈধ বা সাংবিধানিকভাবে অসঙ্গত প্রক্রিয়ায় নির্বাচন করতে গেলে তা গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের দৃষ্টি কোথায়?
১. অন্তর্বর্তী সরকারের সীমাবদ্ধতা
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের ‘গণ-অভ্যুত্থান’–পরবর্তী প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান এখনও অস্পষ্ট তারা কি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করছে, নাকি নতুন রাজনৈতিক রূপরেখা তৈরির ম্যান্ডেট নিয়েছে?
২. নির্বাচনপন্থী রাজনৈতিক দল বনাম সাংবিধানিক বিতর্ক
ফরহাদ মজহার প্রশ্ন তুলেছেন—যখন মৌলিক সাংবিধানিক অবস্থাই অস্পষ্ট, তখন নির্বাচন চাওয়া কি রাজনৈতিকভাবে যুক্তিসঙ্গত?
এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন বিতর্ক উস্কে দিচ্ছে।
৩. স্থিতিশীলতা ও সংঘাতের দ্বন্দ্ব
রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনকে স্থিতিশীলতার পথে অগ্রসর হওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখলেও কিছু চিন্তক ও গবেষক মনে করছেন—অপরিকল্পিত নির্বাচন বরং নতুন অস্থিরতা তৈরি করবে।
বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রক্রিয়া সবসময়ই আন্তর্জাতিক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু—দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ভারসাম্য, বাংলাদেশ–ভারত–চীন সম্পর্ক, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র ইস্যু সবই এই নির্বাচনের ওপর নির্ভরশীল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ফরহাদ মজহারের বক্তব্য তাই শুধু অভ্যন্তরীণ সতর্কবাণী নয়এটি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক আর্কিটেকচার পুনর্বিবেচনার আহ্বান হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এই মন্তব্য দেশে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করবে, বাংলাদেশ কি দ্রুত নির্বাচনেই উত্তরণ দেখবে, নাকি প্রথমে সাংবিধানিক কাঠামো পরিষ্কার করে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা জরুরি?
আগামী কয়েক মাস রাজনৈতিক দল, অন্তর্বর্তী সরকার ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো কোন পথে এগোয় তা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ধারার ওপর বড় প্রভাব ফেলবে।
















