উজবেকিস্তানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় বিষয়বস্তু প্রকাশের অভিযোগে এক শিয়া মুসলিম তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা একটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার বরাতে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সামারকন্দের ২২ বছর বয়সী সুন্নাতিল্লো আকপারভের বিরুদ্ধে জননিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকিসংবলিত বিষয়বস্তু প্রচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর পাঁচ থেকে আট বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
আকপারভ একটি টেলিগ্রামভিত্তিক শিয়া ধর্মীয় গোষ্ঠী পরিচালনা করতেন। সেখানে শিয়াদের প্রচলিত ধর্মীয় শোকগাথা প্রকাশ করা হতো। পুলিশের অনুরোধে উজবেকিস্তানের ধর্মবিষয়ক কমিটি এসব বিষয়বস্তু পরীক্ষা করে এক দিনের মধ্যেই প্রতিবেদন দেয়। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, প্রকাশিত বিষয়বস্তু বিভিন্ন মতাদর্শিক আন্দোলনের কার্যক্রম ও শিক্ষাকে উৎসাহিত করেছে।
তবে শিয়া সম্প্রদায়ের সদস্যদের দাবি, এসব ধর্মীয় শোকগাথায় উগ্রবাদ বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের আহ্বান নেই। এগুলো মূলত কারবালার যুদ্ধ ও ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের স্মরণে প্রচলিত ধর্মীয় সংগীত। সামারকন্দের এক শিয়া মুসলিম জানিয়েছেন, আকপারভকে পাঠানো কয়েকটি শোকগাথার বক্তব্য ছিল বিশ্বাসীদের মনোবল ধরে রাখা এবং ধর্মের জন্য নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ করা।
সামারকন্দের পুলিশ জুনের শেষ দিকে আকপারভকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে জননিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকিসংবলিত উপকরণ ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁকে সামারকন্দ অঞ্চলের একটি তদন্ত কারাগারে নেওয়া হয়েছে বলে তাঁর স্বজনেরা জানিয়েছেন। তবে কারাগার কর্তৃপক্ষ পরে দাবি করেছে, আকপারভ সেখানে আটক নেই।
আকপারভের পরিবারের সদস্যরা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন বলে পর্যবেক্ষণ সংস্থাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর পরিবারের নিয়োগ করা প্রথম আইনজীবীও নাকি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে কর্তৃপক্ষ তাঁকে কারাগারে পাঠানোর ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
এটি উজবেকিস্তানে শিয়া মুসলিমদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় কর্মকাণ্ড ঘিরে চলমান চাপের একটি অংশ বলে অভিযোগ উঠেছে। সামারকন্দে গত কয়েক মাসে অন্তত দশজন শিয়া মুসলিমের বাড়িতে পুলিশ কোনো আনুষ্ঠানিক পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি চালিয়েছে বলে দেশটির বাইরে থাকা কয়েকজন শিয়া মুসলিম অভিযোগ করেছেন।
সামারকন্দের আরেক শিয়া মুসলিম আনভার আলিয়েভও একই ধরনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীতে শিয়া বিশ্বাস নিয়ে আলোচনা করার অভিযোগে তাঁকে চার বছরের স্থগিত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তিনি বাড়িতে থেকে ওই দণ্ডের শর্ত মেনে চলছেন এবং গাড়ির যন্ত্রাংশ মেরামতের কাজ করছেন বলে তাঁর সম্প্রদায়ের সদস্যরা জানিয়েছেন।
তল্লাশি ও হয়রানির অভিযোগ শুধু আটক ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সামারকন্দের এক শিয়া মুসলিম জানিয়েছেন, তাঁর পরিবারের বাড়িতে গত কয়েক বছরে বহুবার তল্লাশি চালানো হয়েছে। তাঁর দাবি, পুলিশের নিয়মিত চাপের কারণে তাঁর বাবা গুরুতর মানসিক চাপে পড়েছিলেন এবং পরে মারা যান। আকপারভ গ্রেপ্তারের পরও তাঁদের বাড়িতে আবার তল্লাশি চালানো হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধেও পরে একই ধরনের উগ্রবাদ-সংক্রান্ত তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগে তিনি ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। উজবেকিস্তানের কর্তৃপক্ষ তাঁকে একটি পুরোনো চাঁদাবাজির মামলায়ও খুঁজছে বলে জানিয়েছে।
ধর্মীয় বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের কারণে সুন্নি মুসলিমরাও সরকারি চাপের মুখে পড়ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাশখন্দের এক সুন্নি মুসলিমকে রাষ্ট্র অনুমোদিত এক ইমামের বক্তব্য পুনঃপ্রকাশের কারণে জরিমানা করা হয়েছিল। উচ্চ আদালতে তাঁর আপিলও খারিজ হয়। পরে পুলিশ তাঁকে আদালতে করা অভিযোগের কপি নিয়ে থানায় হাজির হওয়ার জন্য কয়েকবার চাপ দেয়। তিনি এটিকে ভয় দেখিয়ে আদালতে অভিযোগ করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা বলে মনে করছেন।
উজবেকিস্তানে রাষ্ট্রীয় নিবন্ধন ছাড়া ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সম্মিলিতভাবে ধর্মচর্চা করার সুযোগ সীমিত। মুসলিমদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সুন্নি ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের অধীন সম্প্রদায়গুলোই মূলত অনুমোদন পায় বলে পর্যবেক্ষণ সংস্থাটি জানিয়েছে। শিয়া মুসলিম ও রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত কাঠামোর বাইরে থাকা অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায়ের নিবন্ধনের আবেদনও নিয়মিতভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় বিষয়বস্তু প্রকাশের ক্ষেত্রেও কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থানের অভিযোগ রয়েছে। কয়েক বছর আগে বুখারা ও সামারকন্দের শিয়া মুসলিমদের ধর্মীয় বিষয়বস্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছিল। ওই সতর্কতার পর অনেকে নিজেদের হিসাব বন্ধ করে দেন অথবা ধর্মীয় লেখা ও অন্যান্য বিষয়বস্তু মুছে ফেলেন বলে মানবাধিকারকর্মীদের দাবি।
এদিকে উজবেকিস্তানের সাবেক এক সুন্নি ইমামও অনলাইনে ধর্মীয় বক্তব্য প্রকাশের কারণে দেশটির কর্তৃপক্ষের মামলার মুখে রয়েছেন। তিনি কয়েক বছর আগে নিরাপত্তার কারণে দেশ ছেড়ে তুরস্কে যান। পরে উজবেকিস্তানের অনুরোধে তুরস্কের কর্তৃপক্ষ তাঁকে আটক করে এবং প্রত্যর্পণের আশঙ্কায় একটি বন্দিশিবিরে রাখে। চলতি বছরের মে মাসে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হলেও পরে রাশিয়ার সরকারি গ্রেপ্তারি তালিকায় তাঁর নাম আবার যুক্ত করা হয়।
ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা পর্যবেক্ষণ সংস্থার মতে, এসব ঘটনা উজবেকিস্তানে ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকাশ, অনলাইনে ধর্মীয় আলোচনা এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে সম্মিলিত ধর্মচর্চার ওপর বাড়তে থাকা বিধিনিষেধের চিত্র তুলে ধরছে।
















