বাংলাদেশ, বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি, ক্রমবর্ধমান সাগরপৃষ্ঠ, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার বিরুদ্ধে লড়াই করতে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ২৩২.৬ বিলিয়ন ডলার ঘাটতির মুখে পড়ছে। এই ঘাটতি মূলত দেশের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (NDC) পূরণের অংশ, যা দেখায়—বাংলাদেশ নিজে খুব কম ক্ষতি করলেও টিকে থাকার জন্য তাকে কত বিশাল মূল্যের লড়াই করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের জলবায়ু কৌশল বিশদভাবে নির্ধারিত হয়েছে—বাঁধ নির্মাণ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও লবণ-সহিষ্ণু কৃষি উন্নয়ন। কিন্তু প্রতিবছর ২৩ বিলিয়ন ডলার লাগবে, যেখানে বর্তমান তহবিল প্রাপ্তি এর কাছাকাছি নয়।
পরিবেশভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ (CI) বলছে, উন্নয়ন ব্যাংকগুলো প্রায় ৭২০ মিলিয়ন ডলার অনুমোদন করেছে, কিন্তু মাত্র ২৩২ মিলিয়ন ডলার (৩২%) বিতরণ হয়েছে। যা মোট চাহিদার ০.১% এরও কম। এভাবে গেলে বাংলাদেশ “জলবায়ু ঋণের ফাঁদে” পড়বে।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংক জানায়—২০১৬ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত বাংলাদেশে ৭.২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে, যার মধ্যে ৪.১ বিলিয়ন অভিযোজন ও ৩.১ বিলিয়ন প্রশমন খাতে। তবে এ পরিমাণও বার্ষিক ২৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় অতি সামান্য।
চাষিদের বাস্তব অবস্থা
সাতক্ষীরার ৩৬ বছর বয়সী কৃষক সেলিম আল মামুন বলেন,
“মাটি ফেটে গেছে, লবণাক্ত হয়ে গেছে, জমি আর আগের মতো ফসল দেয় না। বারবার ঘূর্ণিঝড়ে বাধ ভেঙে যায়, আমরা হাত দিয়ে মেরামত করি। এখন চিংড়ি-কেরি চাষ করি, কিন্তু প্রতিটি ঝড় সাগরের লবণকে আরও ভেতরে ঠেলে দেয়। গতবছর খাবার কিনতেই ঋণ নিতে হয়েছে। এখন আমি শুধু লবণাক্ত বৃষ্টির কারণে ঋণে জর্জরিত।”
ঋণ বনাম অনুদান
CI মনে করে বাঁধ বা আশ্রয়কেন্দ্রের মতো অভিযোজন প্রকল্পের জন্য ঋণ নেওয়া টেকসই নয়। এতে ঋণের চাপ বাড়ে, সামাজিক ব্যয় কমে যায় এবং ঋণ-সংকট তৈরি হয়।
বিশ্বব্যাংক দাবি করে, তারা কম সুদ বা সুদবিহীন দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেয় এবং অভিযোজনের জন্য সবুজ তহবিল (GCF) থেকে অনুদান প্রয়োজন।
কোথায় ঋণ কার্যকর হতে পারে?
শুধু আয়ের সুযোগ তৈরি করা যায় এমন প্রকল্পে, যেমন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে। বাংলাদেশ ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০% নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের লক্ষ্য নিয়েছে। এজন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ দিচ্ছে, যা ঝুঁকি কিছুটা কমায়।
বিশ্ব পরিস্থিতি
২০২৪ সালে উন্নয়ন ব্যাংকগুলো ১৩৭ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু খাতে দিয়েছে। এর মধ্যে ৮৫.১ বিলিয়ন গিয়েছিল নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে, আর ২৬.৩ বিলিয়ন অভিযোজন খাতে। ২০৩০ সালের মধ্যে তারা প্রতিবছর ১২০ বিলিয়ন দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রাপ্তি অল্প এবং টুকরো টুকরো প্রকল্পে ছড়িয়ে আছে।
অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ
- শুধু গরমেই বাংলাদেশ ২০২৪ সালে ১.৭৮ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি বহন করেছে, যা জিডিপির প্রায় ০.৪%।
- IMF ১.১৫ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে।
- বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশকে অবশ্যই অনুদান, “ঋণ-মুক্তির বিনিময়ে জলবায়ু পদক্ষেপ (debt-for-climate swaps)”, এবং জাতীয় জলবায়ু তহবিল নিশ্চিত করতে হবে।
যুব সমাজের কণ্ঠ
যুব সংগঠনের প্রতিনিধি সিদুর রহমান সিয়াম বলেন:
“এত বড় সিদ্ধান্তে তরুণদের অংশগ্রহণ জরুরি।”
স্বেচ্ছাসেবক মাশরুর ইশরাক যোগ করেন:
“স্কুলভিত্তিক শিক্ষা, স্থানীয় সচেতনতা ও তরুণদের নেতৃত্ব ছাড়া এই রূপান্তর হবে অসম্পূর্ণ।”
কূটনীতিকদের জন্য জলবায়ু অর্থনীতি হলো ঋণ, অনুদান ও প্রতিশ্রুতির হিসাব। কিন্তু সাতক্ষীরার কৃষক মামুনের কাছে এটা প্রশ্ন—তার সন্তানরা উত্তরাধিকার হিসেবে জমি পাবে, নাকি কেবল ঋণের খাতা।
বাংলাদেশের জন্য ২৩২ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি শুধু অর্থের বিষয় নয়, এটা বেঁচে থাকার হিসাব।
















