অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের নীল জলে ভাসতে ভাসতে হঠাৎই এক বিশালাকার তিমির চোখের দিকে তাকিয়ে পড়েছিলেন ব্রাজিলিয়ান আলোকচিত্রী মার্সিয়া রিডেরার। সেই মুহূর্তটি আজও তাঁর জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।
“মনে হয়েছিল সময় থেমে গেছে। যেন সে আমার আত্মার ভেতর তাকিয়ে আছে,” স্মৃতিচারণ করে বলেন রিডেরার। “তিমিটির চোখ ছিল প্রায় আমার মাথার সমান বড়। সে সত্যিই আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।”
২০২৩ সালের জুন মাসে অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে একটি ডোয়ার্ফ মিনকে তিমির সঙ্গে এই বিরল সাক্ষাৎ ঘটে। তিমিটির কৌতূহলী আচরণ এবং সরাসরি চোখে চোখ রাখার মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করেন তিনি। সেই ছবিই তাঁকে ২০২৫ সালের ‘ওশান ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারে সেরা ফাইন আর্ট ফটোগ্রাফারের সম্মান এনে দেয়।
সাদা-কালো ছবিটিতে ডোয়ার্ফ মিনকে তিমিটিকে এমনভাবে দেখা যায় যে সেটি যেন কোনো জলরঙের চিত্রকর্ম। ছবির সূক্ষ্ম রেখা, আলোর ব্যবহার এবং তিমির অভিব্যক্তি দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে বিচারক ও গভীর সমুদ্রের আলোকচিত্রী লরাঁ বালেস্তা ছবিটিকে “সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যের প্রতিচ্ছবি” বলে আখ্যা দেন। তাঁর ভাষায়, “এটি এমন একটি শিল্পকর্ম, যেখানে বাড়তি কিছু যোগ করারও প্রয়োজন নেই, আবার কিছু বাদ দেওয়ারও সুযোগ নেই।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডোয়ার্ফ মিনকে তিমি পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় সামুদ্রিক প্রাণীগুলোর একটি। বছরে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফই একমাত্র স্থান, যেখানে এরা নিয়মিতভাবে জড়ো হয়।
Dwarf Minke Whale প্রজাতির তিমিগুলো সাধারণত ৮ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এবং তাদের আচরণ অত্যন্ত কৌতূহলী। গবেষকরা জানান, মানুষের প্রতি তাদের আগ্রহ অসাধারণ। তারা প্রায়ই সাঁতারু বা নৌকার চারপাশে ঘুরতে থাকে এবং পাশ ফিরে নিজেদের সাদা পেট দেখায়, যা তাদের সামাজিক ও প্রজনন আচরণের অংশ।
রিডেরার বলেন, “তারা আমাদের ঠিক ততটাই পর্যবেক্ষণ করে, যতটা আমরা তাদের করি। তারা এসে থেমে যায়, আমাদের দেখে, যেন জানতে চায় আমরা কারা।”
তবে অস্ট্রেলিয়ার আইনে এই তিমিগুলোকে স্পর্শ করা নিষিদ্ধ। কারণ এতে মানুষ ও তিমি উভয়েরই ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। তাই রিডেরার শুধু তাদের উপস্থিতি উপভোগ করেছেন এবং দূরত্ব বজায় রেখে ছবি তুলেছেন।
সমুদ্রজীববিজ্ঞানী Alastair Birtles তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই তিমি নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, “মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে এর চেয়ে গভীর সংযোগের অভিজ্ঞতা খুব কমই পাওয়া যায়। অনেক মানুষ এই সাক্ষাতের কথা বলতে গিয়ে আবেগে কেঁদে ফেলেন।”
ডোয়ার্ফ মিনকে তিমি সম্পর্কে এখনো অনেক কিছু অজানা। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, তারা প্রতিবছর হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ মহাসাগরে খাদ্যের সন্ধানে যায়। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং খাদ্যের সংকট তাদের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে।
রিডেরারের আশা, তাঁর ছবিগুলো মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে সংযুক্ত হতে সাহায্য করবে।
তিনি বলেন, “ওদের চোখের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তারাও আমাদের মতোই জীবন্ত সত্তা। তারা ভয় পায়, কৌতূহলী হয়, ক্ষুধার্ত হয় এবং নিজেদের সন্তানদের রক্ষা করার চেষ্টা করে। তাই তাদেরও আমাদের মতো সম্মান ও নিরাপদভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ পাওয়া উচিত।”















