দিন কিংবা রাত, কোথাও শান্তিতে বসার উপায় নেই। যেখানেই একটু বসা, সেখানেই মশার ঝাঁক। ক্লাসরুমে মশার কামড়ে টিকতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। তারা ক্লাসে বসে পড়াশোনা করবে, নাকি মশা তাড়াবে- এ নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম সংকট। রাজশাহীর তানোর পৌরসভায় দীর্ঘদিন ধরে মশা নিধনের ওষুধ স্প্রে না করায় মশার উপদ্রব এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পৌরবাসীর অভিযোগ, বিগত কয়েক বছর ধরে এখানে কোনো মশা নিধনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যার ফলে পৌর কর্তৃপক্ষ এখন চরম উদাসীনতার পরিচায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যেও মশার এই উৎপাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পালপাড়া মোড়ে চা খাওয়ার সময় পৌর নাগরিক বাক্কার ও হাবিবুর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দোকানে এক মিনিট শান্তিতে বসে এক কাপ চা খাওয়ার উপায় নেই। চারদিক থেকে মশা ঘিরে ধরে। অথচ পৌরসভা থেকে মশা নিধনের কোনো ব্যবস্থা নেই। যেকোনো নাগরিক সেবা বা চারিত্রিক সনদ নিতে গেলে ঠিকই নিয়ম করে ট্যাক্স-টাকা গুনতে হয়। জনগণের করের টাকা নেওয়া হলে কেন মশা নিধনের ব্যবস্থা করা হবে না?
উপজেলা মোড়ের চা-দোকানি ডলার জানান, সন্ধ্যার পর থেকে দোকানে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়ে। অথচ কয়েক হাত দূরেই পৌর ভবন, কিন্তু মশা মারার কোনো উদ্যোগ চোখেই পড়ে না। মোস্তফা নামের এক নাগরিক বলেন, ছোট আকারের এই মশাগুলো কামড়ালেই শরীর জ্বালাপোড়া করে। বাধ্য হয়ে সার্বক্ষণিক কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হচ্ছে।
নাগরিকদের অভিযোগ, পৌর ভবনের দক্ষিণ-পশ্চিমে মূল রাস্তার পাশে এবং গোল্লাপাড়া মাঠের পশ্চিমে বিশাল আবর্জনার স্তূপ (ভাগাড়) জমে আছে, যা দীর্ঘদিন ধরে পরিষ্কার করা হয় না। হিন্দুপাড়াসহ আশপাশের ড্রেনগুলোও আবর্জনায় ঠাসা। গোল্লাপাড়া খালের ভেতরের ময়লা-আবর্জনা পচে চারদিকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা মশার প্রধান প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
থানা মোড়ের উত্তর-পশ্চিমে মডেল পাইলট উচ্চবিদ্যালয়, মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়, বালিকা বিদ্যালয় এবং এ কে সরকার সরকারি কলেজসহ তানোর পৌর সদরে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আশপাশের ড্রেন ও মার্কেটের নিচের অংশে মলমূত্র ও আবর্জনা জমে থাকায় শিক্ষার্থীরা মশার কামড় খেয়েই ক্লাস করতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী মশার যন্ত্রণায় স্কুলেই আসতে চাচ্ছে না। বিদ্যুৎ চলে গেলে এই ভোগান্তি আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
শিক্ষকেরা আক্ষেপ করে বলেন, আমরা যে পৌরসভার নাগরিক, তা বলতেও কষ্ট হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা রোগব্যাধির প্রকোপ বাড়ছে, এই সময়ে নিয়মিত মশা নিধনের ওষুধ ছিটানো জরুরি ছিল। প্রতিবছর সরকারিভাবে বরাদ্দ এলেও তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রতি শনিবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি ঘোষণা করলেও বাস্তবে তানোর পৌরসভায় এর কোনো কার্যকারিতা নেই।
কালীগঞ্জ, তালন্দ ও গোল্লাপাড়া হাটের ব্যবসায়ীরা জানান, হাটের ভেতরের ড্রেনগুলো কখনোই পরিষ্কার করা হয় না। অথচ এই হাটগুলোর ইজারা বা নিলাম থেকেই পৌরসভার মূল রাজস্ব আদায় হয়।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা জানান, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে সারা দেশের মতো তানোর পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলরদের অপসারণ করে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক ও ওয়ার্ড সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু এরপর থেকেই মূলত তৃণমূলের নাগরিক সেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ তাদের সমস্যার কথা কাউকে জানাতে পারছে না। পৌর সেবা আবার জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে দ্রুত নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই বলে তারা মনে করেন।
মশা নিধনের সামগ্রিক বিষয়ে জানতে তানোর পৌরসভার বর্তমান প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাঈমা খাঁনের সরকারি মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
















