প্রায় ৭৫০ বছর ধরে টিকে থাকা মার্টন কলেজ লাইব্রেরি আজও ইতিহাসের এক বিস্ময়কর নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়-এর এই গ্রন্থাগারটি অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের আগের সময়ের, এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
মধ্যযুগে বই ছিল অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। ছাপাখানা না থাকায় প্রতিটি বই হাতে লিখে তৈরি করতে মাসের পর মাস সময় লাগত। তাই গ্রন্থাগারের বই রাখা হতো বিশেষ কাঠের বাক্সে, যা খুলতে একসঙ্গে তিনজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির উপস্থিতি প্রয়োজন হতো।
১২৭৬ সালে ক্যান্টারবেরির আর্চবিশপের নির্দেশনায় কলেজের শিক্ষার্থীদের বই দান বাধ্যতামূলক করা হয়, যার মাধ্যমেই এই গ্রন্থাগারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। এরপর থেকে এটি নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রয়েছে।
শুরুর দিকে এখানে কোনো আলাদা লাইব্রেরিয়ান বা তাক ছিল না। বইগুলো বাক্স থেকে ধার নেওয়া ও ফেরত দেওয়ার একটি নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি ছিল। পরে কিছু বই টেবিলে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা শুরু হয়, যাতে সবাই প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারে।
১৪শ শতকে গ্রন্থাগারের জন্য আলাদা একটি কক্ষ নির্মাণ করা হয় এবং সেখানে বই সংরক্ষণের নতুন পদ্ধতি চালু হয়। অনুভূমিক তাক ব্যবহার করে বই সোজাভাবে রাখা শুরু হয়, যা ব্রিটেনে প্রথমবারের মতো ব্যবহৃত হয়েছিল। তখন বইয়ের মলাট ভেতরের দিকে রেখে নাম লেখা থাকত বাইরের পাতায়, কারণ বইগুলো শিকল দিয়ে বাঁধা থাকত।
বর্তমানে কিছু বই ঐতিহ্য ধরে রাখতে শিকলে বাঁধা থাকলেও অধিকাংশ বই আধুনিক নিয়মে সাজানো। তবুও গ্রন্থাগারের মধ্যযুগীয় কক্ষটি আজও প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে, যা একে জীবন্ত টাইম ক্যাপসুল হিসেবে পরিচিত করেছে।
এই গ্রন্থাগারটি শুধু প্রাচীনতার জন্যই নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত ব্যবহারের কারণেও বিশেষ। ইতিহাসবিদদের মতে, এত দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহৃত এমন গ্রন্থাগার কক্ষ পৃথিবীতে খুব কমই আছে।
১৯শ শতকে এটি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তখন এর রঙিন কাচের জানালা এবং বিরল পাণ্ডুলিপি দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করত। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে ১৫শ শতকের বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম ক্যান্টারবেরি টেলস-এর একটি প্রাচীন সংস্করণও।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গ্রন্থাগারকে নিয়ে নানা দাবি ওঠে। একসময় এটিকে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে পুরোনো গ্রন্থাগার বলা হতো, আবার কেউ কেউ একে বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো গ্রন্থাগার বলেও উল্লেখ করেছেন। তবে বর্তমান গবেষকরা এ ধরনের দাবির ক্ষেত্রে সতর্ক। তারা এটিকে ইউরোপের অন্যতম প্রাচীন কার্যকর একাডেমিক গ্রন্থাগার হিসেবে বর্ণনা করেন।
বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো গ্রন্থাগার নিয়ে বিতর্ক এখনও রয়েছে। আল-কারাউইইন লাইব্রেরি এবং সেন্ট ক্যাথরিন মঠের গ্রন্থাগার-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও এই দাবির প্রতিযোগিতায় রয়েছে।
বর্তমানে ডিজিটাল যুগে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে এই গ্রন্থাগারও নতুন রূপ নিচ্ছে। এর পাণ্ডুলিপিগুলো ডিজিটাল আকারে সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে মানুষ এগুলো দেখতে পারে।
তবে কর্তৃপক্ষের মতে, প্রযুক্তির উন্নতি হলেও গ্রন্থাগারের মূল আকর্ষণ থাকবে এর ঐতিহাসিক পরিবেশ এবং মানুষের সঙ্গে জ্ঞানের সংযোগ।
৭৫০ বছরের এই দীর্ঘ যাত্রা প্রমাণ করে, বই শুধু জ্ঞানের উৎস নয়, বরং ইতিহাস ও সমাজের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা সময়ের সীমানা পেরিয়ে আজও মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে যাচ্ছে।
















