একটানা প্রায় দুই বছর অনুপস্থিত থেকেও অধ্যক্ষ পদের বেতন ভাতা পাচ্ছেন লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক শরওয়ার আলম। তিনি আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত আছেন।
অভিযোগে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতা শরওয়ার আলম উপজেলার মহিষখোচা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে জালিয়াতির মাধ্যমে তিনটিতে তৃতীয় বিভাগ নিয়েও ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের প্রভাষক পদে গত ১৯৯৭ সালের ১৮ অক্টোবর নিয়োগ পান। পরে প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ শহিদুর রহমান অবসর গ্রহণ করলে দলীয় প্রভাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন তিনি।
এরপর ক্ষমতার দাপটে পূর্বপদে ইস্তফা না দিয়ে ১২ বছরের স্থানে মাত্র ১০ বছরের অভিজ্ঞতায় ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি অধ্যক্ষ পদ বাগিয়ে নেন শরওয়ার আলম। শিক্ষক অভিভাবকসহ স্থানীয়রা তার জাল-জালিয়াতির প্রমাণসহ অভিযোগ করেও তাকে সরাতে পারেননি। দলীয় প্রভাবে প্রতিষ্ঠানের নামে লাখ লাখ টাকা সরকারি বরাদ্দ নিয়ে আত্মসাৎ করেন বলেও অভিযোগ আছে।
গত ২০২৪ সালের জুলাই মাসে আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী আন্দোলন শুরু হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত বন্ধ করে দেন ওই আওয়ামী নেতা। আজ অবধি প্রতিষ্ঠানের হাজিরা খাতায় অনুপস্থিত রয়েছেন তিনি। এভাবে টানা প্রায় দুই বছর প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত থেকেও বেতন ভাতা পাচ্ছেন জুলাই আন্দোলনে হত্যা মামলার আসামি এ অধ্যক্ষ। যা নিয়ে নানা সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
গত ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট তার নিয়োগের জাল-জালিয়াতি নিয়ে আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত অভিযোগ করেন শিক্ষক শিক্ষার্থী ও স্থানীয় অভিভাবকরা। অভিযোগটি আমলে নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি তদন্ত করে সত্যতা পেয়ে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন। যার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুর ই আলম সিদ্দিকী তাকে গত ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট সাময়িক বরখাস্ত করেন।
এ আদেশ স্বাভাবিকভাবে ৩ মাস পরে বাতিল হলে তিনি সম্পূর্ণ বেতন পাচ্ছেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, বেতনের একটি বড় অংশ কর্তৃপক্ষকে উৎকোচ দিয়ে অনুস্থিত অধ্যক্ষ বেতন ভাতা নিচ্ছেন।
তার অনুপস্থিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব পালন করছেন সহকারী অধ্যাপক আবুল হোসেন। এদিকে তার বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের ৭ বছর অনুপস্থিত সমাজকর্মের সহকারী অধ্যাপক ৪ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি (বর্তমানে গ্রেপ্তার) আবু হেনা মোস্তফা জামানকে বেতন ভাতা প্রদান, প্রতিষ্ঠানের ইট খোয়া নিজের বাড়িতে পাচার, প্রতিষ্ঠানে ফ্যান চুরি মামলা আপোষের নামে চোরের কাছ থেকে অর্ধ লাখ টাকা আত্মসাৎ এবং প্রতিষ্ঠানে অনিয়মিতসহ নানান অভিযোগ উঠেছে।
অধ্যক্ষ শরওয়ার আলম প্রতিষ্ঠানে দুই বছর অনুপস্থিত থেকেও বেতন ভাতাসহ সব সুবিধা ভোগ করায় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক কর্মচারীরা অনেকেই অনিয়মিত। যার কারণে ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ মুখ থুবড়ে পড়ছে। শিক্ষার পরিবেশ ফেরাতে কঠোর নজরদারিসহ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি শিক্ষার্থী অভিভাবকসহ স্থানীয়দের।
শিক্ষার্থী মাজেদুল বলেন, অধ্যক্ষ শরওয়ার আলম জুলাই আন্দোলন থেকে প্রতিষ্ঠানে আসেন না। পুকুর পাড় নির্মাণের নামে ১৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়েছেন। তিনি না এসে বেতন পাওয়ায় বাকি শিক্ষকদের অনেকেই না এসে বেতন তুলতে শুরু করেছেন। এখন দুই একটি ক্লাস ছাড়া আর ক্লাস হচ্ছে না।
অভিভাবক নজরুল ইসলাম বলেন, কেউ না এসে বেতন পাচ্ছেন আর একজন ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পেয়ে প্রতিষ্ঠানের পরিত্যক্ত ভবনের বারান্দার ইট খোয়া বাড়িতে নিয়েছেন। চুরির মামলা আপসের নামে টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। সবাই এসব নিয়ে ব্যস্ত, পড়ালেখার দিকে কারও নজর নেই। ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটি শেষ হয়ে যাচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যালয় শাখার সহকারী প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) তমিজার রহমান বলেন, অধ্যক্ষ স্যার জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকে প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত। অন্য প্রতিষ্ঠানে মব সৃষ্টি হলেও এখানে এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। তবে শুনেছি, তদন্ত কমিটি তার নিয়োগ জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ায় লজ্জায় ও ভয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানে আসেন না। তার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই।
কলেজ শাখার সহকারী অধ্যাপক এটিএম আতাউর রহমান বলেন, আওয়ামী ক্ষমতার দাপটে জাল-জালিয়াতি করে প্রভাষক ও পরে ইস্তেফা না দিয়ে ১০ বছরের অভিজ্ঞতায় অধ্যক্ষ পদে বাগিয়ে নেন শরওয়ার আলম। টানা প্রায় দুই বছর অনুপস্থিত থেকেও রহস্যজনকভাবে বেতন ভাতা পাচ্ছেন তিনি। তার এই কাণ্ড দেখে অনেকেই এখন এ প্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত। যে যার মতো আসেন আর চলে যান। ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। শুনেছি, পলাতক অধ্যক্ষ পুনরায় যোগদানের চেষ্টা করছেন।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আবুল হোসেন বলেন, ইউএনও স্যার প্রতিষ্ঠানের সভাপতি তার নির্দেশে অনুপস্থিত অধ্যক্ষ শরওয়ার আলমকে বেতন ভাতা দিতে হচ্ছে। তিনি প্রতিষ্ঠানে না এসেও বেতন পাবেন আর আমি অতিরিক্ত দায়িত্ব কেন পালন করব? সরকার তাকে যেহেতু বেতন দিচ্ছে তো তাকে কর্মস্থলে ফেরালেই হয়। আমারও ইচ্ছে নেই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে। আমি যে পদে বেতন ভোগ করি সে পদের ক্লাস নিয়ে চলে যাব। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিধান কান্তি হালদার বলেন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বেতন ভাতার শীট প্রস্তুত করে দেন আমি অনুমোদন করি মাত্র। এতে কোনো ধরনের লেনদেনের সুযোগ নেই। তিনি যদি ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে পালনে অনিচ্ছুক হন তবে লিখিত জানালে আমরা অন্য কাউকে দায়িত্ব দেব। পলাতক অধ্যক্ষ পুনরায় যোগদান করতে একটা লিখিত আবেদন করেছেন। আমরা তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
















