অবশেষে তিন বছরের দীর্ঘ বন্দিত্বের পর ইরানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন দুই ফরাসি নাগরিক—সিসিল কোলার (৪১) ও তার সঙ্গী জ্যাক প্যারিস (৭২)। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আটক এই যুগলের মুক্তি নিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ “অপরিসীম স্বস্তি” প্রকাশ করেছেন।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ ম্যাক্রোঁ জানান, তেহরানের উত্তরে অবস্থিত কুখ্যাত এভিন কারাগার থেকে দুজনকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তারা এখন ফরাসি দূতাবাসের পথে। তিনি একে “প্রথম ধাপ” হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, তাদের দ্রুত ফ্রান্সে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
২০২২ সালের মে মাসে ইরান সফরে গিয়ে আটক হন কোলার ও প্যারিস। ইরান সরকার দাবি করেছিল, তারা ফ্রান্স ও ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করছিলেন। কিন্তু ফরাসি কর্তৃপক্ষ ও তাদের পরিবার সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছিল, এই ভ্রমণ ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও পর্যটনমূলক।
দুজনই শিক্ষক পেশায় ছিলেন—যদিও জ্যাক প্যারিস অবসরপ্রাপ্ত। তাদের আটককে পশ্চিমা দেশগুলো “রাষ্ট্রীয় বন্দি নেওয়ার কৌশল” হিসেবে দেখছে, যা ইরান প্রায়ই কূটনৈতিক চাপ তৈরিতে ব্যবহার করে বলে অভিযোগ।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এস্মাইল বাঘাই বলেছেন, বিচারকের নির্দেশে তারা “শর্তসাপেক্ষ জামিনে মুক্তি” পেয়েছেন এবং পরবর্তী বিচার পর্যন্ত তদারকিতে থাকবেন। ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল বারো জানিয়েছেন, দুজনেই এখন ফরাসি রাষ্ট্রদূতের আবাসে নিরাপদে আছেন এবং শারীরিকভাবে সুস্থ। তবে ঠিক কবে তারা দেশ ছাড়তে পারবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তাদের আইনজীবী দল জানায়, ১,২৭৭ দিনের অন্যায় আটক অবশেষে শেষ হলো। এই মুক্তি আসে এক সংবেদনশীল সময়ে—যখন ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পর্ক ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের পর পুনর্বহাল হয়েছে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা, যার প্রভাবে ইরানের অর্থনীতি আরও চাপে পড়েছে।
গত মাসে এক গোপন বিচারে কোলারকে ২০ বছর ও প্যারিসকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাদের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়, বিশেষ করে জুন মাসে ইসরায়েলি হামলায় এভিন কারাগারের ক্ষয়ক্ষতির পর।
২০২২ সালের অক্টোবরে ইরানি টেলিভিশনে কোলারকে ‘স্বীকারোক্তি’ দিতে দেখা যায়—যা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, জোরপূর্বক আদায় করা হয়েছিল। পরিবার জানায়, এখন তারা গভীর স্বস্তি অনুভব করছে। কোলারের মা-পিতা পাস্কাল ও মিরেই এক বিবৃতিতে বলেন, “ওরা এখন যেন ফ্রান্সের এক ছোট কোণে, যদিও আমরা জানি শুধু—ওরা আর কারাগারে নেই।”
ফ্রান্স এই বন্দিত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করেছিল, যেখানে অভিযোগ করা হয়, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে ফরাসি নাগরিকদের টার্গেট করছে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে হঠাৎ ফ্রান্সের অনুরোধে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়—যা অনেকের মতে, দুই দেশের মধ্যে গোপন আলোচনার অংশ ছিল।
ইরান ইঙ্গিত দিয়েছিল, এই মুক্তি হতে পারে একটি বন্দি বিনিময় চুক্তির অংশ। এতে ফ্রান্স থেকে ইরানি নাগরিক মাহদিয়েহ এসফানদিয়ারিকেও মুক্তি দেওয়া হতে পারে, যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সন্ত্রাসবাদ প্রচারের’ অভিযোগে আটক ছিলেন। গত মাসে তাকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়, যা তেহরান স্বাগত জানায়।
ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বারো এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
ইরানে এখনো আটক রয়েছেন আরও কয়েকজন ইউরোপীয় নাগরিক, তাদের মধ্যে রয়েছেন সুইডিশ-ইরানি গবেষক আহমদরেজা জলালি—যিনি ২০১৭ সালে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন।
তেহরানের নিঃসঙ্গ কারাগারের দেয়াল ভেদ করে অবশেষে মুক্ত আকাশের আলোয় ফিরলেন সিসিল ও জ্যাক। তিন বছরের দীর্ঘ নিঃশ্বাসবন্দী সময়ের পর তাদের পদচিহ্নে এখন এক নতুন ভোরের সুর—যেখানে স্বাধীনতার হাওয়া ফিসফিস করে বলে, “তোমরা আবার ঘরে ফিরছো।”
















