২৪ ঘণ্টায় ২০৬ মিলিমিটার বৃষ্টি: ‘এ যেন মেঘভাঙা জল!’ নগরজুড়ে সীমাহীন ভোগান্তি, কর্মজীবী মানুষ দিশেহারা। ভয়ঙ্কর বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত ঢাকা দেশজুড়ে সতর্কতা জারি
ঢাকা: রাজধানী ঢাকা কি এখন এক বিশাল হ্রদ? গত ২৪ ঘণ্টার অভূতপূর্ব বৃষ্টিপাত শেষে এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে নগরবাসীর মনে। আবহাওয়া অফিসের সব রেকর্ড ভেঙে এই সময়ে ঢাকা শহরে ঝরেছে ২০৬ মিলিমিটার জল। এমন বর্ষণ সাম্প্রতিককালে দেখেনি মহানগরবাসী।

আবহাওয়ার বিশেষ সতর্কতা
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের (BMD) কর্তব্যরত পূর্বাভাস কর্মকর্তা কাজী জেবুন্নেসা জানান, পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট সুস্পষ্ট লঘুচাপের প্রভাব এবং মৌসুমী বায়ু অত্যন্ত সক্রিয় থাকার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসের কারণে দেশের সকল সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি করা হয়েছে।
হাঁটু জলে অসহায় নগর
বুধবার রাত থেকে শুরু করে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত টানা এই বর্ষণে ঢাকার স্বাভাবিক গতি সম্পূর্ণ থমকে যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে মানুষ দেখে, তাদের প্রিয় শহরটি হাঁটু থেকে কোমর সমান জলে ডুবে আছে।
- ভোগান্তির চিত্র: মিরপুর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শান্তিনগর, মতিঝিল—শহরের এমন কোনো প্রধান এলাকা নেই, যেখানে জল জমেনি। বিশেষ করে পুরান ঢাকার অলিগলিতে পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ।
- যানজটের যন্ত্রণা: প্রধান সড়কগুলোতে জল জমার কারণে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। অনেক গণপরিবহন মাঝ রাস্তাতেই বিকল হয়ে পড়ায় কর্মস্থলমুখী মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। কারো কারো কাছে এই দিনটি ছিল যেন “নৌকাযাত্রা”র অভিজ্ঞতা!
নিষ্কাশন ব্যবস্থার ব্যর্থতা আবারো প্রমাণ
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু এবং বঙ্গোপসাগরের গভীর সঞ্চালন এই রেকর্ড বৃষ্টির মূল কারণ। তবে সাধারণ মানুষ এবং নগর পরিকল্পনাবিদরা এই দুর্যোগকে দেখছেন অন্য চোখে। তাদের মতে, নগরের দুর্বল ও অপরিকল্পিত জল নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণেই সামান্য বৃষ্টিতেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।
রিকশাচালক কাসেম মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “ভাই, বৃষ্টি তো আল্লাহর দান। কিন্তু এই শহরে জল সরার পথ নাই। সারাদিন রিকশা চালাইছি, আর জল ঠেলছি। কামাই তো হয়ই নাই, উল্টা ভিজা জ্বরে পড়ুম মনে হয়।”
এই অপ্রত্যাশিত বৃষ্টি যেন আবারও প্রমাণ করে দিল, আধুনিক নগরায়ণের স্বপ্ন দেখলেও, সামান্য প্রকৃতির রোষেই ঢাকা কতটা অসহায়! এই জল-যন্ত্রণার স্থায়ী সমাধান কবে মিলবে, সেই প্রশ্ন এখন সকলের মুখে।

আগামী ৭২ ঘণ্টার পূর্বাভাস
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, এই বৃষ্টিপাতের স্পেলটি ৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অংশে অব্যাহত থাকতে পারে।
পরবর্তী ৭২ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম এবং সিলেট—দেশের সব বিভাগের অনেক স্থানেই ভারী থেকে অতি-ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
- বিপজ্জনক সতর্কতা: ভারি থেকে অতি-ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা করছে বিএমডি।
- নগরীর জন্য সতর্কতা: সাময়িক জলবদ্ধতা ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন অংশে দেখা দিতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, আবহাওয়াবিদরা দৈনিক ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিকে ‘ভারি বর্ষণ’ হিসেবে গণ্য করেন। সেই হিসাবে, ঢাকায় এই ২০৬ মি.মি. বৃষ্টিপাতকে অতি-ভারী বৃষ্টিপাত হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, যা নগরের দুর্বল নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করেছে।
















