চৌদ্দ শতকের এক কিশোর, যিনি শতাব্দী পেরিয়ে আজ ইতিহাসের নিঃশব্দ সাক্ষী— তার অস্থিতে লুকিয়ে ছিল ইউরোপের সবচেয়ে ভয়ংকর মহামারির চিহ্ন। স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবরায় প্রথমবারের মতো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ মিলেছে ব্ল্যাক ডেথ বা বুবোনিক প্লেগের উপস্থিতি।
সেন্ট জাইলস ক্যাথেড্রালের প্রাঙ্গণ থেকে ১৯৮১ সালে উত্তোলিত ১১৫টি মধ্যযুগীয় দেহাবশেষের মধ্যে এক কিশোরের দাঁতের প্লাকে পাওয়া গেছে প্লেগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার জিনগত উপাদান। নতুন প্রজন্মের ডিএনএ বিশ্লেষণ, আইসোটোপিক পরীক্ষা ও রেডিওকার্বন ডেটিংয়ের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এই বিস্ময়কর তথ্য উদঘাটন করেছেন।
এডিনবরো সিটি কাউন্সিলের প্রত্নতত্ত্ব কিউরেটর জন লসন একে বলেছেন “অত্যন্ত রোমাঞ্চকর আবিষ্কার”। তিনি জানান, কিশোরটির কবর দেওয়া হয়েছিল যত্নের সঙ্গে— যেভাবে তখনকার প্লেগে মৃতদের সাধারণত ভয়ংকর গণকবরে ফেলা হতো না।
এই দেহাবশেষের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩০০ থেকে ১৩৭০ সালের মধ্যে— ঠিক সেই সময়, যখন ব্ল্যাক ডেথ ইউরোপজুড়ে মৃত্যুর ছায়া বিস্তার করেছিল। সেই মহামারি এক দশকের মধ্যেই প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল।
জন লসন জানান, “এই কিশোরের দাঁতে পাওয়া ডিএনএ আমাদের জানাচ্ছে— সে সত্যিই ব্ল্যাক ডেথে মারা গিয়েছিল। ইতিহাসে যার কথা আমরা জানতাম, এখন তার সঙ্গে যুক্ত হলো এক জীবন্ত প্রমাণ।”
সেন্ট জাইলস ক্যাথেড্রালের নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১১২৪ সালে। প্রায় নয়শো বছর পুরনো এই স্থাপনার নিচে পাঁচ স্তরের কবরের সন্ধান মেলে— প্রতিটি স্তর প্রায় এক শতাব্দীর সময়কাল জুড়ে বিস্তৃত।
এডিনবরো ৯০০ প্রকল্পের অংশ হিসেবে পরিচালিত এই গবেষণায় স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশেষজ্ঞরা মুখ পুনর্গঠনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। এডিনবরো কলেজ অব আর্টের ডিজাইন বিভাগের সিনিয়র লেকচারার ড. মারিয়া ম্যাকলেনান ও তার দল বেশ কয়েকজন মধ্যযুগীয় নাগরিকের মুখাবয়ব পুনর্গঠন করেছেন যার মধ্যে আছেন এক দ্বাদশ শতাব্দীর পুরুষ, পঞ্চদশ শতাব্দীর এক নারী এবং দুই তীর্থযাত্রী।
তাদের মুখগুলো এখন প্রদর্শিত হচ্ছে সেন্ট জাইলসের প্রদর্শনী “এডিনবরোর প্রথম নাগরিকেরা: মধ্যযুগের অজানা মুখ ও জীবনের গল্প”-এ, যা চলবে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত।
গবেষকরা আরও জানিয়েছেন, কবরস্থ ব্যক্তিদের জন্মস্থান নির্ধারণেও তারা সফল হয়েছেন। জলীয় উপাদানে থাকা রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অধিকাংশের জন্ম লোথিয়ান অঞ্চলে, আর কয়েকজনের জন্ম স্কটিশ হাইল্যান্ডসে।
সিটি কাউন্সিলের সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়বিষয়ক কনভেনার মার্গারেট গ্রাহাম বলেন, “এই নতুন গবেষণার মাধ্যমে আমরা আমাদের অতীতের মানুষদের জীবনের আরও কাছে যেতে পেরেছি। ব্ল্যাক ডেথের সময়ে মারা যাওয়া এক তরুণের সন্ধান আমাদের ইতিহাসকে আরও গভীরভাবে অনুভব করায়।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের শহর এক প্রাচীন ইতিহাস বহন করে, আর এই আবিষ্কার সেই ইতিহাসের অজানা অধ্যায় উন্মোচন করেছে। আমি নিশ্চিত, এখনো অনেক গল্প মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছে, যা একদিন আবার জেগে উঠবে।”
















