চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে কুমিল্লায় অন্তত ২৫০ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর বেশির ভাগই হয়েছে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে। এছাড়া বিড়ি-সিগারেটের টুকরো, অসতর্ক অবস্থায় চুলা থেকে কিংবা গ্যাস সিলিন্ডার ও গ্যাস লাইন লিকেজ হয়ে এবং কয়েল থেকেও বেশকিছু অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় কোনো প্রাণহানি না ঘটলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
এদিকে মাত্র তিন মাসে জেলাজুড়ে এত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নাগরিকরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অগ্নিকাণ্ডের মতো বিপদ থেকে বাঁচতে সবাইকে সতর্ক হতে হবে। এছাড়া অগ্নিনির্বাপণের প্রাথমিক অভিজ্ঞতাও অর্জন করতে হবে।
কুমিল্লা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সূত্র বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে কুমিল্লায় ৭৯টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পরের মাস ফেব্রুয়ারিতে ৬৫টি ও মার্চে সর্বোচ্চ ৯৪টি অগ্নিকাণ্ড হয়। সব মিলিয়ে জেলার ১৩টি ফায়ার স্টেশন থেকে মোট ২৩৮টি অগ্নিকাণ্ডের তথ্য জানা গেছে বলে জানিয়েছে কুমিল্লা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক ইকবাল হোসেন।
এছাড়া চলতি এপ্রিল মাসের শুরুতে চৌদ্দগ্রামে শত্রুতা করে বসতবাড়িতে আগুন এবং সর্বশেষ গত রবিবার দুপুরে জেলার প্রধান বাস টার্মিনাল জাঙ্গালিয়ায় একই সঙ্গে তিন বাসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেশ আলোচনা সৃষ্টি করে। এছাড়া মার্চ মাসে কুমিল্লার লাকসাম, বুড়িচং এবং নগরীতে মাদরাসা, বাড়িঘর ও দোকানপাটে বেশ কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক ইকবাল হোসেন বলেন, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ–এ তিন মাসে আগুনে পুড়ে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তার পরিমাণ ৭ কোটি ৩০ লাখ ২৩ হাজার টাকার।
তিনি জানান, ২৩৮টি দুর্ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১০৭টি আগুন লেগেছে বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে। এছাড়া বিড়ি সিগারেটের টুকরা থেকে ২৪টি, চুলা থেকে ৩৫টি, গ্যাস সিলিন্ডার থেকে ১১টি, গ্যাস লাইন লিকেজ থেকে সাতটি এবং কয়েল থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা রয়েছে ৯টি। শত্রুতামূলক অগ্নিসংযোগ, উত্তপ্ত ছাই ছড়ানোসহ একাধিক কারণে অন্য আগুনগুলো লাগে।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ৪৪ শতাংশ আগুন বৈদ্যুতিক গোলযোগে এবং বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্টতায় ঘটেছে। বাকিগুলোর পেছনে মানুষের অসচেতনতা দায়ী।
এদিকে বৈদ্যুতিক গোলযোগের কারণে নিম্নআয়ের মানুষের বাড়িঘরে অগ্নিকাণ্ডের তথ্য বেশি পাওয়া যায়। এছাড়া বিভিন্ন কল-কারখানা কিংবা পণ্যের গোডাউনে মশার কয়েল কিংবা সিগারেট বিড়ির আগুন থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়ে থাকে। সম্প্রতি বিভিন্ন এলাকায় রান্নার চুলার গ্যাস লাইন লিকেজ এবং সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনায় অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হচ্ছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
লালমাই উপজেলার স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী প্রদীপ মজুমদার বলেন, ‘উপজেলায় ভুলুইন উত্তরে এবং বেলঘর উত্তরে পরপর দুটি বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আমরা জেনেছি সেসব দুর্ঘটনা বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে হয়েছে। লালমাই উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নেই, অন্য জায়গা থেকে গাড়ি এসে আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে করতে সব পুড়ে যায়। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তখন বেশি হয়।’
জানা গেছে, কুমিল্লার ১৭টি উপজেলার মধ্যে ১১ উপজেলায় ১৩টি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন রয়েছে। এর মধ্যে কুমিল্লা ইপিজেড ফায়ার সার্ভিস স্টেশনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে ছয়টি উপজেলায় এখনো ফায়ার সার্ভিস স্টেশন গড়ে ওঠেনি সেখানে দ্রুত স্থাপন করা জরুরি।
ফায়ার সার্ভিস ভলেন্টিয়ারস কোঅর্ডিনেটর নাইমুল হাসান মজুমদার বলেন, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যে অগ্নিনির্বাপণ জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে হবে। কোথাও আগুন লাগলে আতঙ্কিত না হয়ে বরং তা বিস্তৃত হওয়ার আগে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বাড়িঘর, দোকানপাট কল-কারখানায় অবশ্যই সচল ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখতে হবে। প্রতি ছয় মাস পরপর বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং গ্যাসের সংযোগ পরীক্ষা করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মোবাইলে হাজার হাজার নম্বর থাকে, কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের জরুরি নম্বরটি থাকে না। ফায়ার সার্ভিসের হট লাইন নম্বর ১০২। এছাড়া জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল করেও ফায়ার সার্ভিসকে পাওয়া যায়।’
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কুমিল্লা অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ ফিরোজ কবির জানান, বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় বৈদ্যুতিক সংযোগের জন্য গণপূর্ত বিভাগ কাজ করে। বেসরকারি স্থাপনাগুলো তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপন করে থাকে। তারা কখনোই বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছ থেকে সংযোগের জন্য পরামর্শ নেয় না। তবে কেউ যদি আমাদের সহযোগিতা চায় আমরা নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপনের জন্য সহযোগিতা করব।’
















