দেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারের উদ্যোগে রোববার (৫ এপ্রিল) সকাল ৯টা থেকে প্রথম ধাপে ১৮টি জেলার ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে। এদিন ১৮টি জেলার ৩০ উপজেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়।
হাম, মিজলস ও রুবেলা কী একই রোগ? চিকিৎসকের সতর্কতা
শীত বা ঋতু পরিবর্তনের সময় শিশুদের সর্দি-জ্বরকে আমরা অনেক সময়ই সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাই। কিন্তু এই ‘সাধারণ’ লক্ষণের আড়ালেই লুকিয়ে থাকতে পারে মারাত্মক সংক্রামক রোগ হাম।
সম্প্রতি, রাজধানীর একটি হাসপাতালের নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট ( এনআইসিইউ)-এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ডাক্তার মনিরা আক্তার এমনই এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তিনি জানান সময়ের সঙ্গে দ্রুত হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে যায়। কজন আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শেই খুব অল্প সময়ের মধ্যে আরেক শিশুর শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এই ভাইরাস। হাম কোনো সাধারণ রোগ নয়, বরং অবহেলা করলে তা হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত শিশুদের আক্রান্ত করে। এটি মিজলস নামে পরিচিত। এই ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার পর প্রথমে শ্বাসনালিতে সংক্রমণ তৈরি করে এবং পরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। সময়মতো চিকিৎসা না করলে এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এমনকি মস্তিষ্কের জটিলতাও সৃষ্টি করতে পারে।
বেসরকারি গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ডা. মনিরা আক্তার। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে হঠাৎ করেই হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে গিয়েছে। অনেক শিশু হাম নিয়ে আসছে। এমনকি দেখা যাচ্ছে, পরিবারের একটি শিশু থেকে অন্য একটি শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। হাম খুব দ্রুত বাতাসের মাধ্যমে একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে যেতে পারে। তাই হামকে কখনোই সাধারণ রোগ ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়।
হাম, মিজলস, জাপানিজ মিজলস, রুবেলা ও বসন্তের পার্থক্য কী?
ডাক্তার মনিরা আক্তার জানান, অনেকেই হাম, মিজলস, জাপানিজ মিজলস, রুবেলা ও বসন্তকে একই রোগ মনে করেন। তবে এগুলো আলাদা রোগ, যদিও কিছু ক্ষেত্রে লক্ষণ বা নামের কারণে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
- হাম/মিজলস
- হাম এবং মিজলস একই রোগ। মিজলস ভাইরাস দ্বারা হয় এবং অত্যন্ত সংক্রামক।
- জাপানিজ মিজলস
- এটি আসলে হাম নয়, বরং জাপানিজ মিজলস নামে একটি ভিন্ন ভাইরাসজনিত রোগ, যা মশার মাধ্যমে ছড়ায় এবং মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটায়।
- রুবেলা (জার্মান মিজলস)
- রুবেলা একটি আলাদা ভাইরাসজনিত রোগ। এটি তুলনামূলক হালকা হলেও গর্ভবতী নারীদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এটি জন্মগত ত্রুটি সৃষ্টি করতে পারে।
- বসন্ত
- বসন্ত বা চিকেন পক্স ভ্যারিসেলা ভাইরাস দ্বারা হয়। এতে শরীরে পানিভর্তি ফুসকুড়ি দেখা যায়, যা হাম থেকে ভিন্ন।
উল্লেখ্য, হাম এবং রুবেলা এই ২টি রোগের প্রতিরোধে একই টিকা (এমএমআর ভ্যাকসিন) ব্যবহার করা হয়। তবে জাপানিজ মিজলস এবং বসন্ত সম্পূর্ণ আলাদা রোগ এবং এদের সংক্রমণের পদ্ধতিও ভিন্ন।
হাম হওয়ার কারণ
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এর সংক্রমণের মূল কারণগুলো হলো—
- হাম ভাইরাস মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি বা শ্বাসের মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।
- আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা
- একই ঘরে দীর্ঘ সময় থাকা
- আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিসপত্র ব্যবহার করা
- বিশেষ করে যেসব শিশুর টিকা নেয়া হয়নি, তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি।
হাম-এর লক্ষণ (সময় অনুযায়ী)
ডা. মনিরা আক্তার বলেন হামের লক্ষণগুলো ধাপে ধাপে এবং নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী প্রকাশ পায়। যেমন-
প্রথম ধাপ (সংক্রমণের ৭–১৪ দিন পর)
- হালকা থেকে মাঝারি জ্বর
- নাক দিয়ে পানি পড়া
- শুকনো কাশি
- চোখ লাল হওয়া
দ্বিতীয় ধাপ (২–৩ দিন পর)
- মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ
- জ্বর বাড়তে থাকে
তৃতীয় ধাপ (৩–৫ দিন পর)
- উচ্চমাত্রার জ্বর
- মুখ থেকে লালচে ফুসকুড়ি শুরু
চতুর্থ ধাপ
- ফুসকুড়ি সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে
- ধীরে ধীরে জ্বর কমে
জটিলতা
হাম সাধারণত শিশুদের মধ্যে দেখা যায় এবং অনেক সময় সহজে নিরাময় হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, যা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
- নিউমোনিয়া: হাম আক্রান্ত শিশুর ফুসফুসে সংক্রমণ ছড়িয়ে গেলে নিউমোনিয়ার ঝুঁকি থাকে। এটি শিশুর শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা এবং উচ্চ জ্বরের কারণ হতে পারে।
- ডায়রিয়া: হাম সংক্রমণের ফলে হজম প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে যেতে পারে, যার কারণে ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে। এটি শিশুর শরীরে পানি এবং লবণের ঘাটতি তৈরি করে, যা সতর্কতা ছাড়া প্রাণঘাতী হতে পারে।
- কানের সংক্রমণ: হামের সময় কানের সংক্রমণও দেখা দিতে পারে। এটি শিশুর শোনার ক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
- মস্তিষ্কের সংক্রমণ: বিরল হলেও হামের জটিলতা হিসেবে মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটতে পারে। এতে শিশুর মস্তিষ্কে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হতে পারে, এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।
প্রতিরোধের উপায়
- হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা গ্রহণ।
- নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এমএমআর ভ্যাকসিন নেয়া
- আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা
- নিয়মিত হাত ধোয়া ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
- শিশুদের ভিড় থেকে দূরে রাখা
অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ঝুঁকি
অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ঝুঁকির বিষয়টি নিয়ে ডাক্তার মনিরা আক্তার বলেন, গর্ভাবস্থায় নারীদের শরীরে স্বাভাবিকভাবেই কিছু হরমোনাল পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই কারণে ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, বিশেষ করে হাম, তুলনামূলকভাবে দ্রুত শরীরে প্রভাব ফেলতে পারে এবং জটিলতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। গর্ভাবস্থায় হাম আক্রান্ত হলে শুধু তার নিজের শারীরিক অবস্থাই নয়, অনাগত শিশুর ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
হাম আক্রান্ত হলে গর্ভপাত, সময়ের আগে প্রসব বা শিশুর কম ওজন নিয়ে জন্ম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া হাম থেকে সৃষ্ট জ্বর বা শ্বাসজনিত জটিলতা মায়ের শরীরে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে, যা শিশুর সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, রুবেলা সংক্রমণ বিশেষত গর্ভাবস্থার প্রথম ৩ মাসে শিশুর জন্মগত ত্রুটি ঘটাতে পারে, যেমন হৃদযন্ত্রের সমস্যা, শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির প্রতিবন্ধকতা। তাই গর্ভবতী নারীদের টিকা নেয়া ও সংক্রমণ এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন
হামকে কোনভাবেই হালকাভাবে নেয়া যাবে না জানান ডাক্তার মনিরা আক্তার । নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে দেন তিনি—
- দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ জ্বর
- শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
- খাওয়ায় অনীহা বা দুর্বলতা
- খিঁচুনি বা অস্বাভাবিক আচরণ
বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি। হাম অনেক সময় সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে অবহেলা করা হলেও এটি একটি অত্যন্ত সংক্রামক ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগ। সঠিক সময়ে সচেতনতা, টিকা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এই রোগের জটিলতা অনেকটাই এড়ানো সম্ভব। মনে রাখতে হবে, শরীরের ছোট সংকেতগুলোই অনেক সময় বড় সমস্যার আগাম বার্তা হয়ে আসে তাই সচেতন থাকাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
















