ফিলিস্তিনের পক্ষে মন্তব্যকারী ব্রিটিশ সাংবাদিক ও ভাষ্যকার সামি হামদির স্ত্রী সৌমাইয়া হামদি তার স্বামীকে সান ফ্রান্সিসকো বিমানবন্দরে আকস্মিকভাবে আটক করার ঘটনাকে ‘সম্পূর্ণ ধাক্কা’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার আইনজীবীরা আটকাদেশের বিরুদ্ধে জরুরি আইনি চ্যালেঞ্জ দায়ের করেছেন।
স্বামী সামি হামদির সঙ্গে পারিবারিক ছুটির পরিকল্পনা করছিলেন সৌমাইয়া, যখন তার কাছে একটি বার্তা আসে যা সব পাল্টে দেয়। এক বন্ধু তাকে জিজ্ঞেস করেন, “সামিকে অপহরণ করা হয়েছে, এটা কি সত্যি?” এর আগে তিনি তার স্বামী, ব্রিটিশ তিউনিসীয় ভাষ্যকার ও সাংবাদিক সামি হামদিকে ফোন করেছিলেন। সামি তখন ইসরায়েলের গাজায় যুদ্ধ নিয়ে বক্তব্য দিতে যুক্তরাষ্ট্রে সফর করছিলেন। ফোন না ধরায় সৌমাইয়া ধরে নিয়েছিলেন তিনি কোনো অনুষ্ঠানে ব্যস্ত আছেন।
কিন্তু আসলে তাকে মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষ আটক করেছিল, যা ছিল তার জন্য “একটি সম্পূর্ণ ধাক্কার” মতো খবর। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “এমন বার্তা কেউ কখনো পড়তে চায় না।”
ঘটনাটি ছিল ২৬ অক্টোবর রবিবার। সামিকে সান ফ্রান্সিসকো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থামানো হয়। তিনি জানতেও পারেননি যে এর দুদিন আগে ইসলামবিদ্বেষী ও ইসরায়েলপন্থী সামাজিক মাধ্যম প্রভাবশালীদের চাপের মুখে তার ভিসা বাতিল করে দিয়েছিল মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
ইসরায়েলের গাজায় গণহত্যার সমালোচক ৩৫ বছর বয়সী এই সাংবাদিকের আটকের ঘটনা একটি আইনি লড়াইয়ের জন্ম দিয়েছে। তার আইনজীবীরা আটকাদেশের বিরুদ্ধে জরুরি পিটিশন দাখিল করেছেন এবং তার স্ত্রী, ব্রিটিশ সংসদ সদস্য ও যুক্তরাজ্যের নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলো ব্রিটিশ সরকারের কাছে পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। মুসলিম অ্যাডভোকেসি গ্রুপগুলো বলছে, অভিবাসন আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনপন্থী কণ্ঠস্বরকে রুদ্ধ করার যে অভিযান চালাচ্ছে, সামি হামদির ঘটনা তারই সাম্প্রতিক উদাহরণ।
হামদি তার সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র সফরে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি অব্যাহত সমর্থনের ওপর জোর দেন। ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমেরিকান মুসলিম ও ফিলিস্তিনপন্থীদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। রবিবার সকালে তিনি সান ফ্রান্সিসকো বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে থাকাকালীন অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই কর্মকর্তারা তার কাছে আসেন। সৌমাইয়া পরে স্বামীর কাছ থেকে শুনে জানান, তাকে একটি বড় কালো ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়া হয়। হামদি বারবার অনুরোধ করার পর তাকে কেবল একটি টেক্সট বার্তা পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়, যা তিনি মুসলিম নাগরিক অধিকার সংস্থা কেয়ারকে পাঠান। এরপর কর্মকর্তারা তার ফোন কেড়ে নেন।
কয়েক ঘণ্টা পর ক্যালিফোর্নিয়ার গোল্ডেন স্টেট অ্যানেক্স ডিটেনশন সেন্টার থেকে সামি হামদি ৩০ সেকেন্ডের জন্য তার স্ত্রীকে ফোন করতে সক্ষম হন। সৌমাইয়া জানান, তার স্বামী খুবই চাপে ছিলেন। এর কিছুদিন পর তাকে রাতে অন্য একটি কেন্দ্রে স্থানান্তরিত করা হয় এবং আইনজীবীর উপস্থিতি ছাড়াই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আটক হওয়ার পর থেকে তিনি দুবার তার সঙ্গে কথা বলতে পেরেছেন।
এই দম্পতির ১০ মাস বয়সী একটি শিশুসহ তিন সন্তান রয়েছে। সৌমাইয়া বলেন, “বাচ্চারা বুঝতে পারছে না কেন তারা বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। সামি একজন পরিবার-পাগল মানুষ।”
মঙ্গলবার কেয়ারের ক্যালিফোর্নিয়া শাখা হামদির আটকের যৌক্তিকতা তুলে ধরার জন্য ফেডারেল হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন দাখিল করে এবং কর্তৃপক্ষ যেন তাকে দূরে কোথাও সরিয়ে না দেয় সেজন্য জরুরি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ প্রার্থনা করে।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ বা ডিএইচএস বলেছে, হামদি ৭ অক্টোবরের হামাস নেতৃত্বাধীন হামলাকে “উৎসাহিত” করেছিলেন। ডিএইচএস এর মুখপাত্র ট্রিশিয়া ম্যাকলফলিন বলেন, “যারা সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে এবং আমেরিকান জাতীয় নিরাপত্তাকে দুর্বল করে, তাদের এই দেশে কাজ করার বা সফর করার অনুমতি দেওয়া হবে না।” তারা ইসরায়েলপন্থী একটি গোষ্ঠী মেমরির তৈরি একটি সম্পাদিত ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করে হামদির আটককে ন্যায্য প্রমাণ করতে চেয়েছে। তবে হামদি পরে তার মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, “মুসলমানরা কোনো যুদ্ধ উদযাপন করছে না, তারা একটি ন্যায়সঙ্গত উদ্দেশ্যের পুনরুজ্জীবন উদযাপন করছে।” সৌমাইয়া তার স্বামীর বিরুদ্ধে আনা এই অভিযোগকে “আউটরেজিয়াস” এবং “ফিলিস্তিনি অধিকারের পক্ষে তার অ্যাডভোকেসিকে লক্ষ্য করে একটি কুৎসা রটনা” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
হামদির বাবা মোহাম্মদ এল হাচমি হামদি উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্সকে লেখা এক খোলা চিঠিতে বলেন, ইসরায়েলের সমালোচনা কোনো অপরাধ নয় বরং এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব এবং তার ছেলেকে “উত্সাহিত করা উচিত, শাস্তি দেওয়া বা আমেরিকায় প্রবেশে বাধা দেওয়া উচিত নয়।” হামদির আইনি সুরক্ষায় কাজ করা কেয়ারের সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া অফিসের নির্বাহী পরিচালক জাহরা বিল্লু বলেন, এই আইনি চ্যালেঞ্জ হামদির সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার জন্য।
বিল্লু হামদির মামলাটিকে মাহমুদ খলিল, রুমেইসা ওজতুর্ক এবং বাদর খান সুরি সহ আইসিই কর্তৃক আটক হওয়া অন্যান্য ফিলিস্তিনপন্থী বিদেশী অ্যাডভোকেটদের মামলার সঙ্গে তুলনা করেন। অভিবাসন আইনজীবী হাসান আহমাদ বলেন, এটি “অভিবাসন আইনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি অ্যাডভোকেসির ওপর ব্যাপক দমনপীড়নের” প্রতিফলন। তিনি মনে করেন, ইসলামোফোবিয়া এবং ফিলিস্তিনবিরোধী বর্ণবাদ এই ঘটনাগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
কেয়ারের সর্বশেষ সিভিল রাইটস রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সংস্থাটি রেকর্ড ৮,৬৫৭টি অভিযোগ পেয়েছে, যা ১৯৯৬ সালে তথ্য সংকলন শুরু করার পর থেকে সর্বোচ্চ। প্রতিবেদনে এই উল্লম্ফনের কারণ হিসেবে “মার্কিন সমর্থিত গাজায় গণহত্যা” কে দায়ী করা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়ার ঢেউ এনেছে।
যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ ও ডেভলপমেন্ট অফিস বা এফসিডিও জানিয়েছে তারা সামি হামদিকে “কনস্যুলার সহায়তা” দিচ্ছে। তবে সৌমাইয়া এই পদক্ষেপকে “সম্পূর্ণ অপর্যাপ্ত” বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, মার্কিন কর্তৃপক্ষ সামি হামদির ভিসা কেন বাতিল করা হয়েছে সে সম্পর্কে তথ্য পাওয়া থেকে এফসিডিও কর্মকর্তাদের “বাধা দিচ্ছে”।
পাঁচজন ব্রিটিশ সংসদ সদস্য, ন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্টস এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অফ জার্নালিস্টস তার অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানিয়েছেন।
সৌমাইয়া তার স্বামীকে বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে বলেন, “যদি আপনারা তাকে দেশ থেকে বের করে দিতে চান, তবে শুধু তাকে তার বাড়িতে পাঠিয়ে দিন। তার একটি পরিবার আছে যারা তাকে খুব মিস করে এবং তাকে বাড়িতে ফিরে পেলে খুব খুশি হবে। তাকে তার স্বাধীনতা ও মুক্তি থেকে বঞ্চিত করে আটকে রাখার কারণ কী?”
















