দক্ষিণ কোরিয়ার গিয়ংজু শহরে অনুষ্ঠিত এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সম্মেলনের প্রান্তে মুখোমুখি বসলেন দুই দেশের শীর্ষ নেতা— চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনি। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে জমে থাকা বরফ ভাঙার এক নতুন প্রয়াস যেন এই সাক্ষাৎ।
উভয় দেশই জানায়, আলোচনায় তারা সম্পর্ক উন্নয়নের প্রতি “বাস্তববাদী ও গঠনমূলক মনোভাব” প্রদর্শন করেছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট শি বলেছেন— “আমরা কানাডার সঙ্গে একযোগে কাজ করতে আগ্রহী, যাতে সম্পর্ক দ্রুতই সুস্থ, স্থিতিশীল ও টেকসই পথে ফিরে আসে।”
প্রধানমন্ত্রী কারনি জানান, তিনি বৈঠকের ফলাফলে “অত্যন্ত সন্তুষ্ট”। তার ভাষায়, “এটি আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এক মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত— যা নতুন সুযোগ তৈরি করবে কানাডার পরিবার, ব্যবসা ও শ্রমজীবীদের জন্য।”
বৈঠকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কারনিকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, যা তিনি সানন্দে গ্রহণ করেছেন, যদিও নির্দিষ্ট তারিখ এখনও ঘোষণা করা হয়নি।
কানাডার এশিয়া-প্যাসিফিক ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি ভিনা নাজিবুল্লা বলেন, “এই সাক্ষাৎ অবশ্যই এক ইতিবাচক সঙ্কেত, কিন্তু এটি কোনো কৌশলগত জোটে ফেরার ইঙ্গিত নয়। কানাডাকে এখনও সতর্কভাবে এগোতে হবে, কারণ চীনের নীতিগত অবস্থান এখনো আগের মতোই শক্ত।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ কানাডার আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তাই সংলাপের পাশাপাশি সাবধানতা জরুরি।
২০১৮ সালে সম্পর্কের ভিত্তি নড়ে যায়, যখন কানাডা মার্কিন অনুরোধে হুয়াওয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মেং ওয়ানঝৌকে গ্রেপ্তার করে। প্রতিক্রিয়ায় চীন দুই কানাডীয় নাগরিককে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আটক করে। ২০২১ সালে উভয় পক্ষের নাগরিকদের মুক্তি সত্ত্বেও সম্পর্ক আর পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
সম্প্রতি ২০২৪ সালে কানাডা চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক এবং ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করলে উত্তেজনা আবার বাড়ে। জবাবে চীন কানাডার ক্যানোলা, সামুদ্রিক খাদ্য ও শুকরের মাংসের ওপর কর বাড়ায়। বর্তমানে দুই দেশই বাণিজ্য ইস্যু সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট শি বাণিজ্য, জ্বালানি ও অর্থনীতিতে “বাস্তব সহযোগিতা” বৃদ্ধির আহ্বান জানান। অন্যদিকে, কারনি স্পষ্ট করেছেন— তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাণিজ্যের নতুন দিগন্তে কানাডাকে নিয়ে যেতে চান।
কানাডার মার্কিন-বাণিজ্য চুক্তি আগামী বছর পুনর্বিবেচনার মুখে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতিমধ্যে কানাডীয় পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে বিশেষজ্ঞ নাজিবুল্লা বলেন, “চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে দেখা ভুল হবে। একদিকে অতিনির্ভরতা, অন্যদিকে প্রতিরোধ— এই দুই মেরুর মাঝে কানাডাকে নতুন পথ খুঁজে নিতে হবে।”
একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনায় দাঁড়িয়ে কানাডা ও চীনের দুই নেতা যেন ইতিহাসের ভারী পাথর সরিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। তবুও কূটনীতির এই পুনর্জন্মে লুকিয়ে আছে এক সতর্ক বার্তা— অতীতের ছায়া এখনও পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি।
















