বহু বছর ধরে উপেক্ষিত ছিল তারা—যারা ঘাম ঝরিয়ে বিদেশে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরান। এবার সেই প্রবাসীরা প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনের নতুন উদ্যোগে এবার তারা ডাকযোগে নিজেদের ভোট পাঠাতে পারবেন—‘পোস্টাল ভোট বিডি’ নামে একটি অ্যাপের মাধ্যমে শুরু হচ্ছে এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া।
নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, উপসাগরীয় দেশ, ইউরোপ, আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন, যা দেশের মোট ভোটারদের প্রায় ১০ শতাংশেরও বেশি। দীর্ঘদিন তারা ভোটাধিকারের স্বীকৃতি পেলেও, ভোট দেওয়ার কোনো বাস্তব ব্যবস্থা ছিল না। এবার সেই পথ খুলে দিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার, যারা শেখ হাসিনার পতনের পর রাষ্ট্রের নির্বাচন, বিচার ও আইন ব্যবস্থায় সংস্কার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই উদ্যোগকে ‘গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জটিল’ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচনী সংস্কার কমিশনের প্রধান বাদিউল আলম মজুমদার আল জাজিরাকে বলেন, “এটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। সব দেশে একসঙ্গে এটি চালু করা সম্ভব নয়, কিন্তু কোথাও না কোথাও থেকে শুরু করতেই হবে।”
বাংলাদেশের সংবিধান কখনোই প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিষিদ্ধ করেনি, কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতায় তারা বঞ্চিত ছিলেন। ২০০৯ সালের ‘নির্বাচনী তালিকা আইন’ প্রবাসীদের তাদের নিজ জেলা বা পূর্বপুরুষের ঠিকানাকে ভোটকেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু ভোট দেওয়ার কোনো কার্যকর উপায় চালু হয়নি।
এবার ডাকযোগে ভোটের পাশাপাশি প্রবাসীরা অ্যাপের মাধ্যমে নিজেদের নিবন্ধন, ব্যালট ট্র্যাকিং ও প্রেরণের অবস্থা দেখতে পারবেন। নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, “ভোটাররা তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করে নিবন্ধন করবেন। তারপর ডাকযোগে ব্যালট পাঠানো হবে, যা কিউআর কোড স্ক্যান করে অ্যাপে ট্র্যাক করা যাবে।”
ভোট দেওয়ার পর ব্যালট সিল করে পোস্ট অফিস থেকে পাঠাতে হবে, এবং তা সরাসরি স্থানীয় রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছাবে। কমিশনের দাবি, কোনো খাম খোলা বা বিকৃত হলে তা সহজেই ধরা পড়বে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রবাসী শ্রমিকরাই শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে প্রথমে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন—তারা রেমিট্যান্স বয়কট করেছিলেন, যা ছিল প্রতিরোধের এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী বার্তা। হাসিনার পতনের পরবর্তী অর্থবছরে প্রবাসীরা বাংলাদেশে রেকর্ড ৩০ বিলিয়ন ডলার পাঠান।
“আমাদের প্রবাসী শ্রমিকরা দেশের প্রকৃত নায়কেরা। তারা স্বৈরাচারকে সরাতে ভূমিকা রেখেছে, তাই ভোট দেওয়ার অধিকার পাওয়া তাদের প্রাপ্য,” বলেন মজুমদার।
প্রবাসীদের ভোট এখন বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে। অনেক আসনে ভোটারদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই প্রবাসী—তাদের ভোট সহজেই পাল্টে দিতে পারে ফলাফল। ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, “সংখ্যার বাইরে এই ভোটারদের প্রভাব গভীর। তারা সচেতন, আর্থিকভাবে স্থিতিশীল এবং নিজ জেলার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।”
রাজনৈতিক দলগুলো এখন বিদেশে থাকা লাখো ভোটারের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা শুরু করেছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে ভুল তথ্যের ঝুঁকি রয়ে গেছে। সাইফুল্লাহ মনে করেন, “প্রবাসীরা নিজেরাই ভুল তথ্য প্রতিরোধের শক্তিশালী দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারবেন।”
গালফের প্রবাসী শ্রমিক তাহসিন শাকিল বলেন, “আমরা দেশের অর্থনীতির প্রাণ, অথচ দেশে ফিরলেই বিমানবন্দরে অপমান, দূতাবাসে অবহেলা—সব কিছু সহ্য করতে হয়। আমরা শুধু ভোট নয়, মর্যাদা চাই।”
এনসিপির ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, প্রবাসীদের ‘রাষ্ট্র গঠনের অংশীদার ও বাংলাদেশের দূত’ হিসেবে দেখা হবে। তাদের হয়রানি বন্ধ, জরুরি সহায়তা, এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
বিএনপি বলছে, তারা প্রবাসী কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। দলের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্য সাইমুম পারভেজ বলেন, “প্রত্যেক দূতাবাসকে প্রবাসীদের কল্যাণের দায়িত্ব নিতে হবে। তাদের জন্য কর্মসংস্থান ও বাণিজ্য বাড়ানো হবে।”
জামায়াতে ইসলামী প্রবাসীদের ভোটাধিকার বিষয়ে সবচেয়ে আগে আদালতে রিট করেছিল বলে দাবি করেছেন দলের প্রার্থী ও আইনজীবী শিশির মানির। তিনি জানান, “আমরা প্রবাসীদের জন্য একক সেবা কেন্দ্র গড়তে চাই—যেখানে তারা জমি বা আইনি সমস্যার সমাধান পাবেন।”
প্রবাসীদের ভোট এখন কেবল একটি গণতান্ত্রিক সুযোগ নয়—এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এক সময় যে শ্রমিকরা দূরদেশে ঘাম ঝরিয়ে ঘরে টাকা পাঠাতেন, এবার তাদের হাতেই হয়তো নির্ধারিত হবে দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ।
















