ক্যারিবিয়ান সাগরের ঢেউয়ে এবার নতুন ঝড়ের আগমন। ভেনেজুয়েলা স্থগিত করেছে প্রতিবেশী ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর সঙ্গে বড় গ্যাস চুক্তি—কারণ, সেই দ্বীপরাষ্ট্র স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজকে।
রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম টেলেসুর জানায়, প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো সোমবার আদেশ দিয়েছেন, “ত্রিনিদাদ ও টোবাগোকে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের সব চুক্তি অবিলম্বে স্থগিত রাখতে।”
ওই সিদ্ধান্ত আসে এমন সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ধ্বংসকারী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস গ্রেভলি নোঙর করেছে পোর্ট অব স্পেনে। ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার উপকূল ঘেঁষে বেশ কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে। মাদুরো সরকার বলছে, এটি নিছক সামরিক সহযোগিতা নয়, বরং “তাদের দেশের তেল ও গ্যাস সম্পদ লুটের প্রস্তুতি।”
মাদুরো অভিযোগ করেন, ত্রিনিদাদের প্রধানমন্ত্রী কামলা পারসাদ-বিসেসর “আমেরিকান সাম্রাজ্যের বিমানবাহী রণতরীতে” পরিণত করেছেন তার দেশকে।
তিনি বলেন, “যে দেশ নিজে গ্যাসশূন্য হয়ে পড়েছে, তার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলাম আমরা। এখন তারা আমাদের শত্রুর কণ্ঠে কথা বলছে।”
কিন্তু পারসাদ-বিসেসর পাল্টা জবাবে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর সংবাদমাধ্যম নিউজডেকে বলেন, “আমাদের ভবিষ্যৎ ভেনেজুয়েলার দয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়, কোনোদিন ছিলও না।”
তিনি জানান, তার সরকার এখন ‘ড্রাগন গ্যাসফিল্ড’-এর ওপর নির্ভর করছে না—যে প্রকল্পটি ভেনেজুয়েলার পানিসীমার ভেতরে এবং দীর্ঘদিন বিলম্বে আটকে ছিল।
“আমরা কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে নত হব না,” বলেন তিনি, “আমাদের সিদ্ধান্তে ভেনেজুয়েলার কোনো প্রভাব নেই।”
তবুও, দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্কের বরফ আরও পুরু হচ্ছে। মাত্র ১১ কিলোমিটার চওড়া উপসাগর এখন হয়ে উঠেছে উত্তেজনার সীমারেখা।
রবিবার পোর্ট অব স্পেনে পৌঁছায় ইউএসএস গ্রেভলি, সঙ্গে মার্কিন মেরিন বাহিনী। তারা যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে, যা ত্রিনিদাদ সরকার দাবি করেছে ‘নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি’। কিন্তু কারাকাসের চোখে এটি এক স্পষ্ট উসকানি।
ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল পিন্টো জাতিসংঘে বলেন, “আমাদের মাথার ওপর ঝুলছে এক অবৈধ ও অনৈতিক সামরিক হুমকি।”
তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র “মাদকবিরোধী যুদ্ধের ছলে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালাতে চাইছে।”
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর জানায়, তারা ক্যারিবিয়ানে সাতটি যুদ্ধজাহাজ, একটি সাবমেরিন, ড্রোন ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে—আরও আসছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড।
মাদুরো প্রশাসনের মতে, এই অভিযান আসলে “তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের দখল নেওয়ার” ছদ্মযুদ্ধ।
ভেনেজুয়েলা ও ত্রিনিদাদ ২০১৮ সালে যৌথভাবে গ্যাস আহরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রকল্পটিকে থামিয়ে দেয় বহু বছর। ওয়াশিংটন এখন বলছে, প্রকল্পটি চলতে পারবে—তবে যেন মাদুরো সরকার তার থেকে ‘গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সুবিধা’ না পায়।
ব্রিটিশ জ্বালানি জায়ান্ট শেল এবং ত্রিনিদাদের ন্যাশনাল গ্যাস কোম্পানি এই ‘ড্রাগন গ্যাসফিল্ড’ প্রকল্পে জড়িত। সমুদ্রের ওপারেই আছে ‘ম্যানাটি’ গ্যাস প্রকল্প, যা ত্রিনিদাদ অংশে উন্নয়ন করছে শেল, ভেনেজুয়েলার অনুমতি নিয়ে। তবে সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর তার ভবিষ্যৎও এখন অনিশ্চিত।
এই ‘ড্রাগন’ গ্যাসক্ষেত্রে রয়েছে প্রায় ১১৯ বিলিয়ন ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস—যে জ্বালানি পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়ানোর বড় উৎস।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্যানুসারে, ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর জ্বালানির ৯২ শতাংশই আসে গ্যাস থেকে; বাকি অংশ তেল থেকে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ সেখানে মাত্র ০.০২ শতাংশ—যা ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের মধ্যে সর্বনিম্ন।
ক্যারিবিয়ান আকাশে এখন শোনা যায় যুদ্ধজাহাজের গর্জন, সমুদ্রের ঢেউয়ের নিচে ফুটে ওঠে অস্থির আগুনের ছায়া। তেল আর গ্যাসের খেলায়, শান্ত সমুদ্রও যেন হয়ে উঠেছে এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্র।
















