গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের একটি তাবুর ভেতর মৃদু ব্যাটারিচালিত বাতির আলোয় সাত বছরের ছেলে মোহাম্মদকে পড়াচ্ছেন নিভাল আবু আরমানা। টানা দুই ঘণ্টা পড়ানোর পর মা–ছেলের চোখ ক্লান্ত হয়ে আসে। বাস্তুচ্যুত অসংখ্য ফিলিস্তিনি পরিবারের কাছে এখন শিক্ষার চিত্র এমনই—অস্থায়ী আশ্রয়ে, সীমিত আলো আর অনিশ্চয়তার মধ্যে।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলের যুদ্ধের ফলে অধিকাংশ স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। অনেক স্কুল এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা প্রায় বন্ধ থাকায় প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—সব স্তরের শিক্ষার্থীরাই বড় ধরনের শিক্ষাবিরতিতে পড়েছে।
নিভাল জানান, যুদ্ধের আগে তার সন্তানদের দিন ছিল নিয়মমাফিক—স্কুল, খেলাধুলা, পড়ার সময়। এখন দিন কাটে পানি সংগ্রহ, দাতব্য রান্নাঘর থেকে খাবার আনা এবং জ্বালানি জোগাড়ে। পড়াশোনার সময় বের করা কঠিন। তার বড় ছেলে হামজা, বয়স ১৬, আর স্কুলে ফিরতে চায় না। পরিবারের সহায়তায় কাজ করছে, উপার্জনই তার অগ্রাধিকার। মাঝের ছেলে হুজাইফা পড়তে চাইলেও তাবুর অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষে মেঝেতে বসে ক্লাস করতে গিয়ে পিঠ–ঘাড়ে ব্যথা হয়।
আনুষ্ঠানিক হিসাবে, গাজায় প্রায় সাত লাখ পঁয়তাল্লিশ হাজার শিক্ষার্থী নিয়মিত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে, যার মধ্যে উচ্চশিক্ষার শিক্ষার্থীও আছে প্রায় আটাশি হাজার। আন্তর্জাতিক সংস্থার উপাত্ত বলছে, ক্ষতিগ্রস্ত স্কুল ভবনের ৯৫ শতাংশের বেশি পুনর্বাসন বা পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন; উচ্চশিক্ষা ক্যাম্পাস ও কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের বড় অংশও ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত।
গাজার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের ডিন আহমদ আল-তুর্ক বলেন, শিক্ষাব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে হামলার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। অভিজ্ঞ শিক্ষক হারানো মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্ঞানচর্চা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রায়েদ সালহা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানভিত্তি বহু বছরের সঞ্চিত অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠে; মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি বা দীর্ঘ বিঘ্নে তা ভেঙে পড়লে শিক্ষার্থী ও সমাজ—দু’পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অনলাইন শিক্ষাও সহজ নয়। অনেকের কাছে উপযুক্ত যন্ত্র নেই, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট অস্থির। “শিক্ষকেরা পড়াতে চান, শিক্ষার্থীরা শিখতে চায়, কিন্তু প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রায় নেই,” বলেন সালহা। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সামাজিক অভিজ্ঞতা—বন্ধুদের সঙ্গে দেখা, লাইব্রেরি–ল্যাব—এখন অনুপস্থিত, যা শিক্ষার্থীদের পরিচয়বোধকে গড়ে তোলে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ওসামা জিম্মো প্রথমে কম্পিউটার সিস্টেম নিয়ে পড়া শুরু করলেও অনলাইন শিক্ষার সীমাবদ্ধতায় বিষয় বদলে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়েছেন, যাতে বিদ্যুৎ–ইন্টারনেট নির্ভরতা কম। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আংশিকভাবে সশরীরে ক্লাস শুরু হয়েছে। ওসামা বলেন, “পথ পরিষ্কার বলে আমরা পড়ছি না; বরং থেমে যাওয়া যে বাস্তবতা আমাদের দিকে ঠেলে দেয়, তাকে অস্বীকার করতেই পড়ছি।”
গাজায় শিক্ষা এখন কেবল পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়; এটি টিকে থাকার প্রতিজ্ঞা—ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেও ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা।
















