বিশ্বজুড়ে বিরল খনিজ নিয়ে প্রতিযোগিতা যখন তুঙ্গে, তখন বিজ্ঞানীরা বলছেন—এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো আসলে আমাদের চোখের সামনেই লুকিয়ে আছে। আশ্চর্যের বিষয়, এগুলো তুলতে আর পাহাড় খুঁড়ে খনি করার প্রয়োজনও নাও হতে পারে।
অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়-এর একটি পরীক্ষাগারে গবেষকেরা ছত্রাকের অস্বাভাবিক এক ক্ষমতা নিয়ে কাজ করছেন। ছত্রাকের সূক্ষ্ম জালিকাবিন্যাস, যাকে মাইসেলিয়াম বলা হয়, চারপাশের পরিবেশ থেকে পুষ্টির পাশাপাশি কিছু ধাতব উপাদানও শোষণ করতে পারে। গবেষণায় দেখা হচ্ছে, বিশেষভাবে প্রস্তুত মাটিতে থাকা বিরল খনিজ উপাদান ছত্রাক কতটা কার্যকরভাবে শোষণ করতে পারে।
গবেষক দলের প্রধান আলেকজান্ডার বিসমার্ক জানান, ভবিষ্যতে এই পদ্ধতিতে দূষিত শিল্পাঞ্চল থেকেও মূল্যবান খনিজ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে। এই ধারণাকে তারা বলছেন ‘মাইকোমাইনিং’। যদিও এখনো এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে, তবু বড় আকারে প্রয়োগ করা গেলে কৃষিযন্ত্র দিয়েই ছত্রাক সংগ্রহ করা যেতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
বিরল খনিজ বলতে ১৭ ধরনের ধাতব উপাদানকে বোঝায়, যেগুলো ব্যাটারি, চুম্বক, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আধুনিক প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়। নামের সঙ্গে ‘বিরল’ থাকলেও এগুলো পৃথিবীতে খুব কম নয়, বরং কম ঘনত্বে ছড়িয়ে থাকায় উত্তোলন ব্যয়বহুল।
এই উপাদানগুলোর চাহিদা বাড়ছে দ্রুত। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পর্যন্ত কৌশলগত মজুত গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন এবং ইউক্রেন ও গ্রিনল্যান্ডে এসব খনিজের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন। বর্তমানে চীনই বিশ্বব্যাপী বিরল খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে আধিপত্য বজায় রেখেছে।
ছত্রাক ছাড়াও গবেষকেরা নজর দিচ্ছেন শিল্পবর্জ্যের বিশাল স্তূপের দিকে। কয়লা পোড়ানোর পর জমে থাকা ছাই, অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনের বর্জ্য ‘রেড মাড’, এমনকি পরিত্যক্ত চুম্বকেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিরল খনিজ। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু কয়লার ছাই থেকেই বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ বিরল খনিজ উদ্ধার করা সম্ভব।
টেক্সাসের রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেমস টুর ও তার দল ‘ফ্ল্যাশ জুল হিটিং’ নামে এক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। এতে বিদ্যুৎ প্রবাহের মাধ্যমে বর্জ্যকে অত্যন্ত উচ্চ তাপে উত্তপ্ত করে বিরল খনিজ আলাদা করা হয়। এই পদ্ধতিতে তুলনামূলকভাবে কম শক্তি লাগে এবং যন্ত্রপাতিও সহজে স্থানান্তরযোগ্য।
অন্যদিকে, পরিবেশবিদ জুলি ক্লিঙ্গার মনে করেন, বর্জ্যকে নতুন দৃষ্টিতে দেখলে সংকট নয়, বরং সম্ভাবনাই স্পষ্ট হয়। তার মতে, খনন না করে প্রয়োজনীয় উপাদান পাওয়ার পথ খুঁজে বের করাই ভবিষ্যতের সঠিক দিক।
তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বর্জ্য থেকে বিরল খনিজ তুলতে খরচ ও প্রযুক্তিগত জটিলতা এখনো বড় বাধা। কারণ সোনা বা প্লাটিনামের মতো দামি ধাতুর তুলনায় বিরল খনিজের বাজারমূল্য কম। তাই অনেক প্রকল্পই একই সঙ্গে লোহা, কার্বন বা জ্বালানির মতো অতিরিক্ত উপাদান আহরণের পরিকল্পনা করছে।
এই উদ্যোগগুলো সফল হলে একদিকে যেমন দেশগুলো নিজেদের প্রয়োজনীয় খনিজ নিজেই সংগ্রহ করতে পারবে, অন্যদিকে দূষিত পরিবেশ পরিষ্কার করার সুযোগও তৈরি হবে। গবেষকদের আশা, এতে শিল্প ও পরিবেশ রক্ষার মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের জায়গায় এক ধরনের সহাবস্থান গড়ে উঠতে পারে।
















