জার্মানির মিউনিখে শুরু হতে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সম্মেলনের আগে ইউরোপজুড়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা। এর পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগত অবস্থান ও বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি, যা গত এক বছরে ইউরোপ-আমেরিকা সম্পর্ককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
এক বছর আগে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইউরোপের অভিবাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নীতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ইউরোপের সবচেয়ে বড় হুমকি বাইরের নয়, ভেতর থেকেই আসছে। সেই বক্তব্যে উপস্থিত বিশ্বনেতারা বিস্মিত হন। এরপর ট্রাম্প প্রশাসনের একের পর এক সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দেয়।
মিত্র ও প্রতিপক্ষ—উভয়ের ওপর শুল্ক আরোপ, ভেনেজুয়েলায় বিতর্কিত অভিযান, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে মস্কোর অনুকূলে শান্তি প্রচেষ্টা এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার দাবি—সব মিলিয়ে ইউরোপের নিরাপত্তা ভাবনাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এবারের সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও। ৫০টির বেশি দেশের শীর্ষ নেতারা এতে অংশ নিচ্ছেন। এমন সময় এই সম্মেলন হচ্ছে, যখন ইউরোপের নিরাপত্তা ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গত বছরের শেষ দিকে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ইউরোপকে নিজের প্রতিরক্ষার প্রধান দায়িত্ব নিজেকেই নিতে বলা হয়েছে। এতে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আর আগের মতো তাদের নিরাপত্তার মূল ভরসা থাকতে চাইছে না।
এই উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে গ্রিনল্যান্ড সংকটকে ঘিরে। ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড তার নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রয়োজন। এমনকি সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও একসময় উড়িয়ে দেননি তিনি। গ্রিনল্যান্ডের জনগণ এই ধারণা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করলেও ডেনমার্ক সরকার সতর্ক করে দেয়, এমন পদক্ষেপ ন্যাটো জোটের ভিত্তিকেই নড়িয়ে দেবে।
এই সংকট আপাতত থেমে থাকলেও প্রশ্ন থেকে গেছে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিরাপত্তা সম্পর্ক কি অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে? সাবেক ব্রিটিশ গোয়েন্দা প্রধান স্যার অ্যালেক্স ইয়াংগারের মতে, সম্পর্ক বদলেছে, কিন্তু ভেঙে পড়েনি। তার মতে, ইউরোপকে নিজের প্রতিরক্ষায় আরও বড় ভূমিকা নিতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের প্রতিরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের বড় আর্থিক ও সামরিক অবদান ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষোভের অন্যতম কারণ। তবে বিভাজন শুধু সামরিক ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্য, অভিবাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও ইউরোপ ও ট্রাম্পপন্থীদের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক ইউরোপীয় নেতাদের উদ্বিগ্ন করেছে।
মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের যে কৌশল বহুপাক্ষিকতা, অর্থনৈতিক সংহতি ও গণতন্ত্রের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, ট্রাম্প প্রশাসনের সময় সেই তিন স্তম্ভই দুর্বল হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ন্যাটোর অনুচ্ছেদ পাঁচ এখনো কার্যকর আছে কি না। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একটি সদস্য দেশের ওপর হামলা মানেই সবার ওপর হামলা। তবে ট্রাম্পের অনিশ্চিত আচরণ ও ইউরোপের প্রতি তার প্রশাসনের মনোভাব এই অঙ্গীকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
এস্তোনিয়ার সীমান্তবর্তী শহর নারভা বা বাল্টিক অঞ্চলের সুয়ালকি করিডোরে সম্ভাব্য রুশ আগ্রাসনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র কী করবে—এই প্রশ্নই এখন ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের ভাবাচ্ছে। ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই অনিশ্চয়তা ভুল হিসাব ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।
এই সপ্তাহের মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা ধারণা দিতে পারে। তবে সেই উত্তর ইউরোপের প্রত্যাশার সঙ্গে মিলবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে।
















