দীর্ঘ কয়েক মাসের তীব্র বাক্যবিনিময় ও কূটনৈতিক উত্তেজনার পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রো। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠেয় এই বৈঠক হবে দুই নেতার প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ।
বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে ভেনেজুয়েলা পরিস্থিতি, মাদক পাচার, তেল, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মাদকবাহী নৌযানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।
গত ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার পর দুই নেতার মধ্যে ফোনালাপ হয়, যা তুলনামূলক সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল। তবে এরপরই পেট্রো প্রকাশ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে।
এর আগে ট্রাম্পও মন্তব্য করেছিলেন যে কলম্বিয়ায় সামরিক অভিযান ‘মন্দ শোনায় না’। ফলে সাম্প্রতিক এই বৈঠককে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মোড় নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
গত কয়েক মাসে পেট্রো বারবার ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় মাদকবাহী নৌযানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সমালোচনা করেছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিরও কঠোর বিরোধিতা করেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন প্রয়োগকারী বাহিনীকে নাৎসি বাহিনীর সঙ্গে তুলনা করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন অভিযোগ করে আসছে, কলম্বিয়া উত্তরমুখী কোকেন প্রবাহ ঠেকাতে যথেষ্ট কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে স্থলভাগেও হামলা সম্প্রসারণের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
তবে কূটনৈতিক সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক ফোনালাপের পর উভয় পক্ষের অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এই যোগাযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর র্যান্ড পল।
কলম্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোসা ইয়োলান্দা ভিয়াভিসেনসিও বলেন, বৈঠকে ভেনেজুয়েলার সীমান্ত নিরাপত্তা একটি বড় বিষয় হবে। কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলার প্রায় দুই হাজার দুইশ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠী ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির প্রভাব রয়েছে। এই গোষ্ঠী মাদক পাচার, চাঁদাবাজি ও অবৈধ খনির সঙ্গে জড়িত বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোর জন্য ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ওই সশস্ত্র গোষ্ঠী বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও কলম্বিয়ার যৌথ স্বার্থের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এই পরিস্থিতিতে পেট্রো ইতোমধ্যে ভেনেজুয়েলা সীমান্তে ত্রিশ হাজার কলম্বীয় সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন।
মাদক পাচার দমনও বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। কলম্বিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোকেন উৎপাদক দেশ হওয়ায় এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যদিও সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যেও দুই দেশের সামরিক ও পুলিশি সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই বৈঠক পেট্রোর জন্য কৌশলগতভাবে লাভজনক হতে পারে। তার মেয়াদ শেষ হবে আগস্টে, আর বৈঠকের ফলাফল তার সমর্থিত উত্তরসূরির রাজনৈতিক সম্ভাবনার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈঠক সফল হলে পেট্রো প্রমাণ করতে পারবেন যে বামপন্থী সরকারও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। আর বৈঠক উত্তপ্ত হলেও তিনি তা জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে তুলে ধরে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন।
















