নাইজেরিয়ার বাণিজ্যিক রাজধানী লাগোসের জলাভূমিতে গড়ে ওঠা বস্তি মাকোকোতে ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে ও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে হাজারো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এই উচ্ছেদের উদ্দেশ্য হলো শহরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দখল করে অভিজাত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। তবে রাজ্য সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
পাঁচ সন্তানের জননী আন্না সোবির কাঠের ঘরটিও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এখন তিনি ও তার সন্তানরা লাগোস লেগুনে ভাঙা কাঠের সংকীর্ণ মাচার ওপর রাত কাটাচ্ছেন, যেখানে কয়েক সপ্তাহ আগেও তাদের ঘর ছিল। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ, পোড়া কাঠ আর ভাঙা টিনের চাদর ভেসে বেড়াচ্ছে পানিতে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বড়দিনের দুই দিন আগে সশস্ত্র পুলিশ ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ ছাড়াই ঘরবাড়ি ভাঙা ও আগুন লাগানো হয়। কোথাও কোথাও মানুষ ঘরের ভেতরে থাকতেই আগুন ধরানো হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মাকোকো মূলত উনিশ শতকে জেলে সম্প্রদায়ের বসতি হিসেবে গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে দরিদ্র মানুষ ও কাজের সন্ধানে আসা অভিবাসীরাও এখানে বসবাস শুরু করে। জনসংখ্যা নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও বিভিন্ন হিসাবে এখানে ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ মানুষের বসবাস ছিল। এখন বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৯৭টি ধর্মীয় স্থাপনা ও তিন হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে, এতে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ। তবে রাজ্য সরকার ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার কোনো পরিসংখ্যান দেয়নি।
আন্না সোবি জানান, উচ্ছেদের সময় তিনি ঘরের ভেতরেই ছিলেন। প্রচণ্ড শব্দে বেরিয়ে এসে দেখেন এক্সকাভেটর ঘর ভাঙছে। তার সন্তানের স্কুলটিও একই দিনে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে আশ্রয় নেওয়া আরেকটি ভবনও ভেঙে ফেলা হয়।
উচ্ছেদের পর অনেক শিশু স্কুলে যাওয়া বন্ধ করেছে। কেউ কেউ ভাঙা কাঠ কুড়িয়ে বিক্রি করে জীবিকা চালানোর চেষ্টা করছে। বৃষ্টিতে ভিজে খোলা জায়গায় রাত কাটাতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।
গত সপ্তাহে এক হাজারের বেশি বাসিন্দা রাজ্য আইনসভা ভবনের দিকে মিছিল করলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। বাসিন্দাদের দাবি, এতে অন্তত একজন আহত হয়। তারা আরও অভিযোগ করেন, আগের উচ্ছেদ অভিযানের সময় টিয়ার গ্যাস ব্যবহারে শিশু সহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, এ বিষয়ে কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
রাজ্য সরকারের তথ্য কমিশনার বলেন, টিয়ার গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ তদন্ত করা হবে এবং সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে ক্ষতি করতে চায় না।
সরকারের দাবি, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ লাইনের নিচে ও গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ঘরগুলো জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তাই উচ্ছেদ ছাড়া বিকল্প ছিল না। গভর্নর জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
তবে অনেক বাসিন্দার সন্দেহ, এই উচ্ছেদের পেছনে রয়েছে অভিজাত আবাসন ও বাণিজ্যিক প্রকল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা। রিয়েল এস্টেট সংশ্লিষ্টদের মতে, লাগোসের জলপথ সংলগ্ন সব এলাকাই অত্যন্ত মূল্যবান জমি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য, লাগোসে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বাড়তি ভাড়া ও পর্যাপ্ত আবাসনের অভাব দরিদ্র মানুষকে অনানুষ্ঠানিক বসতিতে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ চালানো মানুষের জীবন ও জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বাসিন্দা এলিজাবেথ কাকিসিওয়ে বলেন, বাজারে থাকার সময় উচ্ছেদ শুরু হয়। ফিরে এসে দেখেন তার ঘর নেই। সন্তানদের নিয়ে ভেজা মাটিতে কাঠ পেতে রাত কাটাতে হয়। খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
আন্না সোবির কথায়, কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে, আমরা শুধু ঈশ্বরের সাহায্যের অপেক্ষায় আছি।
















