ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর প্রথম জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। এমন প্রেক্ষাপটে কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নির্বাসিত নেতারা বিশ্বাস করছেন, শেখ হাসিনা আবারও দেশে ফিরতে পারেন এবং তা একজন নায়ক হিসেবেই।
বাংলাদেশে তারা এখন অভিযুক্ত আসামি ও পলাতক হিসেবে বিবেচিত। মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও অর্থ আত্মসাতের মতো অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে। অথচ কলকাতার শপিং মলের ভিড়ভাট্টা খাবার দোকানে বসে কফি আর ফাস্টফুডের আড্ডায় তারা নিজেদের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা করছেন।
প্রায় ১৬ মাস আগে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান তাকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে। বিক্ষুব্ধ জনতার অগ্রযাত্রার মুখে তিনি হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান। ওই সময়ের দমন-পীড়নে সহস্রাধিক মানুষ নিহত হয় বলে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এরপর আওয়ামী লীগের হাজারো নেতা-কর্মী দেশ ছাড়েন। সহিংসতা ও একের পর এক মামলার মুখে প্রায় ৬০০ নেতা কলকাতায় আশ্রয় নেন। সীমান্তঘেঁষা এই শহরটিই হয়ে ওঠে দলটির কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার নিরাপদ কেন্দ্র।
গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার জনচাপের মুখে আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম স্থগিত করে এবং দলটিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও প্রচারণা থেকে নিষিদ্ধ করে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রথম ভোট হলেও সেখানে আওয়ামী লীগের কোনো অংশগ্রহণ নেই।
এর মধ্যেই যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে তিনি সেই রায়কে মিথ্যা আখ্যা দিয়ে ভারতে বসেই রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আসন্ন নির্বাচন ভণ্ডুল করতে সমর্থকদের সক্রিয় করার অভিযোগও রয়েছে।
ভারতের দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তায় থাকা শেখ হাসিনা নিয়মিতভাবে বাংলাদেশে থাকা দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। ভারত সরকার বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ উপেক্ষা করায় তার এই তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
আওয়ামী লীগ নেতারা দাবি করছেন, তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া হলে নির্বাচন গণতান্ত্রিক বৈধতা হারাবে। তারা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগে অভিযুক্ত করছেন।
বাংলাদেশে দীর্ঘ সময়ের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এখন দলটি গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলছে। এতে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করছেন। মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম, নির্যাতন, গোপন বন্দিশালা ও ভুয়া নির্বাচনের কথা উঠে এসেছে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারও সমালোচনার বাইরে নয়। সাংবাদিক দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা, সংখ্যালঘু সুরক্ষায় ব্যর্থতা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির অভিযোগ উঠেছে। শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়াও আন্তর্জাতিক মান নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঢেউয়ে আওয়ামী লীগ দাবি করছে, তাদের বহু কর্মী নিহত বা কারাবন্দি হয়েছেন। অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। কলকাতায় অবস্থানরত নেতারা বলছেন, দেশে ফিরলে তাদের হত্যা করা হতে পারে।
ভারতে আওয়ামী লীগের এই তৎপরতা দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। দিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য ভাষণ বাংলাদেশ সরকারের ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে। তবে ভারত সরকার এ বিষয়ে নীরব রয়েছে।
কলকাতায় থাকা অনেক নেতা অতীতের অভিযোগ অস্বীকার করলেও কেউ কেউ স্বীকার করছেন যে শাসনামলে কর্তৃত্ববাদ ও অনিয়ম ছিল। তবুও তাদের বিশ্বাস, আসন্ন নির্বাচন ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি বদলাবে এবং মানুষ আবার আওয়ামী লীগের দিকে ফিরবে।
নির্বাসিত নেতারা মনে করছেন, বর্তমান অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। অন্ধকার সময় পেরিয়ে তারা আবার রাজনীতির মঞ্চে ফিরবেন—এই আশাই তাদের এগিয়ে রাখছে।
















