ড্রোন প্রযুক্তি ও ফরেনসিক মাটি বিশ্লেষণের সাহায্যে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ সরকারের একটি গোপন অভিযান উন্মোচন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দামেস্ক উপকণ্ঠের কুতাইফাহ অঞ্চলের একটি পরিচিত গণকবর থেকে হাজার হাজার মৃতদেহ মরুভূমির ধুমায়ের এলাকায় স্থানান্তর করা হয়—যাতে বছরের পর বছর ধরে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের প্রমাণ গোপন করা যায়।
ফরেনসিক ভূতত্ত্ববিদদের সহযোগিতায় রয়টার্সের দল ড্রোনে তোলা হাজার হাজার ছবি বিশ্লেষণ করে দুই স্থানের মাটির রঙ ও গঠন তুলনা করে। এতে দেখা গেছে, ধুমায়েরের কবরস্থানে মাটির রঙ কৃত্রিমভাবে পরিবর্তিত হয়েছে—যা ইঙ্গিত দেয়, কুতাইফাহের মাটি সেখানে মিশ্রিত করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রতিটি স্থানের মাটির একটি নিজস্ব “স্বাক্ষর” থাকে, যা ভূতাত্ত্বিক প্রভাব ও জৈব উপাদানের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। এই তুলনামূলক বিশ্লেষণই প্রমাণ করছে যে ধুমায়েরের কবরস্থানে বাইরের মাটি যোগ করা হয়েছিল।
স্কটল্যান্ডের দ্য জেমস হাটন ইনস্টিটিউটের ফরেনসিক সয়েল সায়েন্স সেন্টারের প্রধান লর্না ডসন বলেন, “এই বিশ্লেষণ প্রমাণের একটি অংশ মাত্র। এর সঙ্গে সাক্ষীদের বর্ণনা, গোয়েন্দা তথ্য ও অন্যান্য প্রমাণ মিলিয়ে দেখলেই সম্পূর্ণ সত্য উদ্ঘাটিত হয়।”
রয়টার্সের প্রতিবেদকরা প্রথমে ডজনখানেক প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নিয়ে ধুমায়েরের গণকবরের অবস্থান শনাক্ত করেন। এদের মধ্যে ছিলেন ট্রাকচালক, সেনা, যান্ত্রিক কর্মী ও শ্রমিক যারা কুতাইফাহ থেকে মৃতদেহ সরানোর কাজে অংশ নিয়েছিলেন।
রিপোর্টে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত “অপারেশন মুভ আর্থ” নামে একটি গোপন কর্মসূচির মাধ্যমে মৃতদেহ স্থানান্তর করা হয়। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, ধুমায়ের মরুভূমিতে অন্তত ৩৪টি বড় কবরখোঁড়ার কাজ চলে।
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ বেনজামিন রক রোয়টার্সের জন্য ড্রোন উড্ডয়নের পরিকল্পনা তৈরি করেন। ড্রোনটি ৬০ মিটার উচ্চতায় গ্রিড প্যাটার্নে প্রতি দুই সেকেন্ডে একটি করে ছবি তোলে। ধুমায়ের ও কুতাইফাহ মিলিয়ে মোট ৪,৮০০-রও বেশি ছবি সংগ্রহ করা হয়।
এই ছবি থেকে তৈরি উচ্চ-রেজোলিউশন কম্পোজিট ইমেজে স্পষ্ট দেখা যায় মাটির রঙ, বুলডোজারের চিহ্ন ও মাটির স্তরের পরিবর্তন। এই বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ধুমায়েরে খননকৃত মাটি ছিল লালচে ও গাঢ়, যা কুতাইফাহের মাটির রঙের সঙ্গে মিলে যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনসেল কালার সিস্টেম ব্যবহার করে দুই স্থানের মাটির রঙের পার্থক্য নির্ধারণ করেন। কুতাইফাহে মাটির রঙ ছিল ১০আর ৫/২—লালচে ঘন রঙ। ধুমায়েরের মাটিতে একই ধরনের রঙের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
রয়টার্স তদন্তে আরও দেখা যায়, ধুমায়েরে বুলডোজার দিয়ে সমতল করা খনিগুলোর মাটির রঙ আশপাশের অক্ষত জমির তুলনায় অনেক গাঢ়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি তখনই সম্ভব হয় যখন পুরনো কবরস্থান থেকে মাটি সরিয়ে এনে নতুন স্থানে ফেলা হয়।
তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেন, মাটির রঙ পরিবর্তনের কারণ শুধু স্থানান্তরিত মাটি নয়—এতে থাকতে পারে আর্দ্রতা, খনিজ উপাদান বা পচনশীল জৈব পদার্থের প্রভাব।
ধুমায়েরে এখনো মৃতদেহ উত্তোলন বা ডিএনএ পরীক্ষা হয়নি। ফলে কবরের ভেতর ঠিক কতজনের দেহ রয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
ব্রিটেনের বর্নমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক প্রত্নতত্ত্ববিদ ইয়ান হ্যানসন বলেন, “স্যাটেলাইট ও ড্রোনচিত্র সময়রেখা বিশ্লেষণে কার্যকর, তবে চূড়ান্ত প্রমাণ আসবে মাটির নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার মাধ্যমেই।”
১৯৯৫ সালের স্রেব্রেনিৎসা হত্যাযজ্ঞ তদন্তে যেমন মাটির বিশ্লেষণ প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল, তেমনি সিরিয়ার এই কবরস্থানেও ফরেনসিক ভূতত্ত্ব এখন নতুন প্রমাণের পথ খুলে দিয়েছে।
















