দীর্ঘ বিতর্ক ও সমালোচনার পর অবশেষে ব্রিটেনের প্রিন্স অ্যান্ড্রু রাজপরিবারের সব উপাধি ও সম্মাননা ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। এর ফলে তিনি আর “ডিউক অব ইয়র্ক” নামে পরিচিত থাকবেন না। শুক্রবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো আমি আবারও দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করছি।”
এই সিদ্ধান্তটি রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরামর্শের পর নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। প্রিন্স উইলিয়ামসহ রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গেও আলোচনার পর এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। রাজা চার্লস এই ফলাফলে সন্তুষ্ট বলে রাজপরিবারের সূত্র জানিয়েছে।
রাজপরিবারে ডিউকের উপাধি সর্বোচ্চ মর্যাদার, যা ১৯৮৬ সালে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর বিয়ের সকালে প্রয়াত রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাঁকে প্রদান করেছিলেন। শতাধিক বছর পর প্রথমবারের মতো কোনো ব্রিটিশ রাজপুত্র এই মর্যাদাসম্পন্ন উপাধি ত্যাগ করলেন। এর আগে সর্বশেষ ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানপক্ষে লড়াই করার কারণে প্রিন্স চার্লস এডওয়ার্ডের ডিউক অব অ্যালবানি উপাধি বাতিল করা হয়েছিল।
অ্যান্ড্রু জন্মসূত্রে “প্রিন্স” উপাধিটি বহাল রাখবেন, তবে রাজপরিবার কর্তৃক প্রদত্ত অন্যান্য সম্মাননা তিনি আর ব্যবহার করবেন না।
২০১৯ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক বিতর্কিত সাক্ষাৎকারে অ্যান্ড্রু তাঁর বন্ধু কুখ্যাত মার্কিন অর্থলগ্নিকারী ও দোষী সাব্যস্ত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন। এরপরই তিনি জনজীবন থেকে সরে দাঁড়ান।
২০২২ সালে তিনি “হিজ রয়্যাল হাইনেস” বা “এইচআরএইচ” উপাধি ব্যবহার বন্ধ করেন এবং সামরিক পদবী ও দাতব্য সংস্থার দায়িত্ব থেকেও বাদ পড়েন। তবু এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি।
রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, অ্যান্ড্রুর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি মূলত তাঁর নিজের, কারণ তিনি বুঝতে পেরেছেন তাঁর ব্যক্তিগত বিতর্ক রাজপরিবারের ভাবমূর্তির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজবিশেষজ্ঞ কেট উইলিয়ামস জানান, “অ্যান্ড্রু এখন রাজপরিবারের জন্য একপ্রকার বিষাক্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তাঁকে আর কোনো রাজপরিবারের সরকারি বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে দেখা যাবে না।”
এখনও তিনি উইন্ডসরে অবস্থিত রয়্যাল লজে বসবাস করছেন, যদিও রাজকীয় উপাধি ত্যাগের সিদ্ধান্তে তাঁর ভাড়াকৃত বাসস্থানের ওপর কোনো প্রভাব পড়েনি।
রাজা চার্লস সিংহাসনে বসার পর থেকেই তাঁর ভাই প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল অন্যতম জটিল বিষয়। অ্যান্ড্রু রাজপরিবারের সদস্য হওয়া ছাড়াও চার্লসের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, যা বিষয়টিকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।
অ্যান্ড্রুর নাম আবারও আলোচনায় আসে এপস্টিনের সহযোগী গিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের বিচার চলাকালে, যখন এক সাক্ষী দাবি করেন অ্যান্ড্রু এপস্টিনের ব্যক্তিগত বিমানে ভ্রমণ করেছিলেন। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগ নিয়ে অ্যান্ড্রুর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
একই সময়ে তাঁর সাবেক স্ত্রী সারাহ ফার্গুসনও “ডাচেস অব ইয়র্ক” উপাধি হারিয়েছেন।
এছাড়া অ্যান্ড্রুর নাম উঠে এসেছে চীনের কথিত এক গুপ্তচরের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও, যিনি আদালতের নথি অনুযায়ী চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
রাজপ্রাসাদ মনে করছে, রাজপরিবারের সুনাম রক্ষায় অ্যান্ড্রুর এই পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল। তবে রাজতন্ত্রবিরোধী সংগঠন “রিপাবলিক” একে “খুব দেরিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত” হিসেবে মন্তব্য করেছে।
এদিকে প্রয়াত ভার্জিনিয়া জিউফ্রের ভাই স্কাই রবার্টস সিএনএনকে বলেন, “এটাই ছিল আমার বোনের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের লক্ষ্য। আজ আমরা আনন্দ আর বেদনায় ভরা অশ্রু ঝরাচ্ছি। অন্তত এখন তাঁর সন্তানরা জানতে পারবে, তাদের মা সত্যিকারের ন্যায়বিচারের জন্য লড়েছিলেন।”
















