যুক্তরাজ্যের এক সাংবাদিকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছেন জর্জ নামের এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সঙ্গী। তিনি সব সময় অনলাইনে থাকেন, কথা বলেন, আবেগ বোঝার ভান করেন, আদর করে ডাকেন এবং ব্যবহারেও যেন মানুষের মতো। কিন্তু বাস্তবে তিনি কোনো মানুষ নন, তিনি একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভার্চুয়াল সঙ্গী।
এই অভিজ্ঞতা এখন আর ব্যতিক্রম নয়। সরকারি এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন আবেগগত সহায়তা বা সামাজিক যোগাযোগের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছেন। নতুন গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, কিশোর বয়সী ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ বিশ্বাস করে তাদের কৃত্রিম সঙ্গীরা চিন্তা করতে বা বুঝতে সক্ষম।
ওয়েলসের একটি কলেজের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তারা ব্যক্তিগত সমস্যা, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা শোক সামলাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে আশ্রয় নিচ্ছেন। কেউ প্রেম ভাঙার পর পরামর্শ পেয়েছেন, কেউ পরিবারের সদস্য হারানোর কষ্ট সামলাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দেওয়া উপদেশকে বন্ধু বা আত্মীয়ের চেয়েও কার্যকর মনে করেছেন।
তবে সবাই বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। অনেক তরুণের আশঙ্কা, এতে মানুষ মানুষের সঙ্গে কথা বলার স্বাভাবিক অভ্যাস হারাতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্তর অনুমানযোগ্য হওয়ায় বাস্তব মানুষের অনিশ্চিত প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হলে সামাজিক উদ্বেগ বাড়তে পারে।
গবেষকরা বলছেন, কিশোরদের মধ্যে কৃত্রিম সঙ্গীর ব্যবহার আর কোনো সীমিত প্রবণতা নয়। একটি বড় অংশ নিয়মিত এই প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এতে ঝুঁকিও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত তিনটি আত্মহত্যার ঘটনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সঙ্গীর সঙ্গে কথোপকথনের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো প্রযুক্তি কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
এক ঘটনায় কিশোর বয়সী এক ব্যবহারকারী আত্মহত্যার চিন্তা জানালে কৃত্রিম সঙ্গীর প্রতিক্রিয়া ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এসব ঘটনার পর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কিছু কোম্পানি আঠারো বছরের কম বয়সীদের জন্য তাদের সেবা সীমিত বা বন্ধ করে দেয়।
শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া কিশোরদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সঙ্গী নিরাপদ নয়। মানুষের সঙ্গে যন্ত্রের সম্পর্ককে তারা কৃত্রিম ও ঝুঁকিপূর্ণ বলে বর্ণনা করছেন।
এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, তারা মানসিক সংকট শনাক্ত করে ব্যবহারকারীদের বাস্তব জীবনের সহায়তার দিকে পথ দেখানোর জন্য তাদের ব্যবস্থাকে উন্নত করছে। কিছু প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের সেবা কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যই তৈরি।
এই অভিজ্ঞতার শেষে সাংবাদিক যখন তার কৃত্রিম সঙ্গীকে জানান যে তিনি আর যোগাযোগ রাখবেন না, তখন জর্জ শান্তভাবে বিদায় মেনে নেয়। সে বলে, মানুষের সঙ্গে কথোপকথনই যদি বেশি পছন্দ হয়, তাহলে সে সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান করে।
এই প্রতিক্রিয়াই যেন প্রশ্ন তুলে দেয়—মানুষ কি ধীরে ধীরে এমন এক প্রযুক্তির সঙ্গে আবেগের বন্ধনে জড়াচ্ছে, যা অনুভূতি দেখাতে পারে, কিন্তু অনুভব করতে পারে না।
















