হলিউডের জনপ্রিয়তা হারানো মার্কিন কৌতুক অভিনেতা রব শ্নাইডার হঠাৎ করেই হাঙ্গেরির রাজনীতিতে আলোচনায় উঠে এসেছেন। সম্প্রতি তিনি হাঙ্গেরির কট্টর ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের পক্ষে একটি প্রচারণামূলক ভিডিওতে হাজির হন, যা অরবানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করা হয়। এই সমর্থন শুধু ব্যক্তিগত অবস্থান নয়, বরং বৈশ্বিক কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিতে হাঙ্গেরির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার দিকেও ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া ডিউস বিগালো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া শ্নাইডার পরবর্তী সময়ে সমালোচকদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। ক্যারিয়ারের সেই সময় পার করে এখন তিনি নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনৈতিক মতাদর্শের একজন মুখপাত্র হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি হলিউডের তথাকথিত উদারপন্থী প্রভাবের বিরুদ্ধে সরব, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির বিরোধিতা করেন এবং ট্রান্সজেন্ডার ও টিকাবিরোধী বক্তব্যের জন্য পরিচিত।
শ্নাইডারের ভিডিওতে শুধু তিনি একা নন, বরং ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার একাধিক কট্টর ডানপন্থী নেতার বক্তব্যও যুক্ত করা হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়, হাঙ্গেরির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক ডানপন্থী মহলের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর মূল কারণ ভিক্টর অরবানের নেতৃত্বে হাঙ্গেরির ভূমিকা। দেশটি গত এক দশকে কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির একটি পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। ২০১০ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর অরবান ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেন। সমালোচকরা বলছেন, এতে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই সময়কালে হাঙ্গেরিতে বর্ণবাদী সহিংসতা, রোমা জনগোষ্ঠী ও ইহুদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক হামলা এবং উগ্র ডানপন্থী সংগঠনের তৎপরতা বেড়েছে। একই সঙ্গে সরকার গণমাধ্যমের বড় একটি অংশকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে সমালোচনামূলক কণ্ঠ দমনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে।
শিক্ষা ও সংস্কৃতিক্ষেত্রেও সরকারের হস্তক্ষেপ বেড়েছে। উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মুখে পড়েছে, অনেক প্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম সীমিত বা স্থানান্তর করতে বাধ্য করা হয়েছে। শিল্প ও সংস্কৃতি খাতে সরকারপন্থী নিয়োগ এবং নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই নীতিগুলো শুধু হাঙ্গেরির ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশটি এখন বৈশ্বিক কট্টর ডানপন্থী নেটওয়ার্কের একটি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল চিন্তাবিদ, রাজনীতিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা নিয়মিত হাঙ্গেরিতে সম্মেলন ও বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। এসব আয়োজনের মাধ্যমে অভিবাসনবিরোধী, লিঙ্গবৈচিত্র্যবিরোধী ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সংশয়বাদী মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে রব শ্নাইডারের মতো ব্যক্তিত্বের অরবান সমর্থন অনেকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হলেও, বিশ্লেষকদের মতে এটি বৃহত্তর একটি বৈশ্বিক প্রবণতার অংশ। হাঙ্গেরিকে ঘিরে যে কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক জোট গড়ে উঠেছে, তার ভবিষ্যৎ এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘদিন পর অরবান শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে পারেন।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ডানপন্থী মিত্রদের প্রকাশ্য সমর্থনকে হাঙ্গেরির ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সহায়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
















